১ যুগেও কার্যকর হয়নি রায়, ঝুলে আছে আপিল শুনানি

রাশেদুল কবির খান, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

সারাদেশ

সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায় নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সাতটি মানুষকে। আজ সেই ভয়ানক হৃদয়বিদারক

2026-04-27T01:07:17+00:00
2026-04-27T01:07:40+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন
১ যুগেও কার্যকর হয়নি রায়, ঝুলে আছে আপিল শুনানি
রাশেদুল কবির খান, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১:০৭ এএম  আপডেট: ২৭.০৪.২০২৬ ১:০৭ এএম
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। ছবি : সংগৃহীত
সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায় নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সাতটি মানুষকে। আজ সেই ভয়ানক হৃদয়বিদারক সাত খুনের একযুগ পূর্ণ হলো। দেশজুড়ে আলোচিত এ খুনের মামলায় ২০১৭ সালে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন হাইকোর্ট। ২০১৯ সালে আসামি পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে গত ৭ বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটির কার্যক্রম। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের কারণে মামলাটির আপিল শুনানি ঝুলে আছে। দ্রুত শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করে কার্যকর দেখতে চান স্বজনরা।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম। 

ওই সময় র‌্যাবের একটি গাড়িতে তাদের উঠিয়ে নেওয়া হয়। এর তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ ছয়জনের মরদেহ। এবং তারপর দিন ১ মে সিরাজুল ইসলাম লিটনের মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচর থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। 

এই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন। মামলায় শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করেন। এতে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। পরে হাইকোর্ট ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে আছে শুনানিতে।

নিহত যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান স্বপনের পরিবারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছেলে হত্যায় খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর দেখে যাবে সেই আশায় শোকে শোকে শারীরিক অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ সালের ৫ মে ইন্তেকাল করেন স্বপনের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হায়দার আলী খান। ছোট ছেলে সাবেক ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান রিপন খান বৈষম্যবিরোধী মামলার ভয়ে গত ৫ আগস্টের পর গা ঢাকা দিয়েছেন। 

নিহত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি সময়ের আলোকে বলেন, আমরা দীর্ঘ প্রতীক্ষায় রয়েছি- ফাঁসির রায় কার্যকর হবে। আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তিনি বলেন, ‘আসামিরা খুব প্রভাবশালী হওয়ায় তারা জেলে অবস্থান করলেও এলাকায় এখনও তাদের প্রভাব রয়ে গেছে। আমরা আগামীকাল সকাল ১০ টায় মৌচাক মহাসড়কে মানববন্ধন করব।  আপিল বিভাগে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ছেলে হত্যার বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর দাবি করে নিহত তাজুল ইসলামের বাবা বলেন, এখন সরকার পরিবর্তন হয়েছে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রী নজর দেবেন এই আশা আমাদের। নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে রোজা মনি জন্মের আগেই বাবাকে হারায়। এখন তার বয়স ১২ বছর হতে যাচ্ছে। নিহতের স্ত্রী সামসুর নাহার কান্নাকণ্ঠে সময়ের আলোকে বলেন, এখনও সেই বেদনার ভার নিতে পারছে না। 

বিগত সময়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিওেও এখন পর্যন্ত কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায়নি। শুধু আশ্বাস দিয়েছেন তার বাসভবনে ডেকে নিয়ে।  তিনি বলেন, আমার মেয়ের ১২ বছর হয়ে গেল, আমি ভাবিনি বিচার পেতে এত সময় লাগবে। আমি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন করছি, তিনি যেন এ হত্যার রায় কার্যকর করেন এবং  আমরা যেন তা দেখে যেতে পারি। আমার মেয়ে বাবা হারা। অভাব-অনটনের সংসারে আমার মেয়ের জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যেন একটু দায়িত্ব নেন এই আশা আমার।

বহুল আলোচিত এই মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, নিম্ন আদালতে সাজার বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে, হাইকোর্ট আপিলটি দ্রুত নিষ্পত্তি করেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে, মামলাটি উপস্থাপন করা হয়নি। আমরা চাই, দ্রুত আপিল বিভাগে এই মামলাটির শুনানি হোক। শুনানির পর যে রায় হয়, তা কার্যকর হোক।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ দেন।

পরে উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে আদালত ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে অন্যান্য আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আটকে রয়েছে।

তৎকালীন রায় ঘোষণার পর জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক দুই কাউন্সিলর নূর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যে বিরোধের জেরেই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে। 

সুশৃঙ্খল বাহিনী র‍্যাবের উচ্চাভিলাষী কয়েকজন জনতার সঙ্গে মিশে এ হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে। যেখানে শুধু নজরুল একক টার্গেট থাকলেও প্রাণ হারাতে হয়েছে আরও নিরীহ ছয়জনকে। পর্যবেক্ষণে আদালত আরও বলেছেন, এটি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর কিছুসংখ্যক দুষ্কৃতকারী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি তথা সন্ত্রাসীদের কাজ। এখানে নূর হোসেন একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু। 

নজরুল ইসলামও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সিটি করপোরেশনের সাবেক দুই কাউন্সিলর নূর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যকার বিরোধ ও দ্বন্দ্বেই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে। দুজনই সন্ত্রাসী ছিলেন, দুজনের ছিল বিশাল বাহিনী। দুজনই এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। নূর হোসেনের প্রধান টার্গেট ছিলেন নজরুল। কিন্তু এখানে একজন নজরুলকে হত্যা করতে গিয়ে নূর হোসেন বাহিনী ও র‍্যাব সদস্যদের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে নিরীহ আরও ছয়জনকে।

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‍্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মুহাম্মদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা। 

এ ছাড়া র‍্যাবের চাকরিচ্যুত হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, আরওজি-১ এ বি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব আলী, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আলামিন শরীফ ও সৈনিক তাজুল ইসলাম। এর মধ্যে মহিউদ্দিন মুন্সী, আলামিন শরীফ ও তাজুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।

বিচারিক আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পাওয়া নয়জনও র‍্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা ও সদস্য। তাদের মধ্যে কনস্টেবল হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল বাবুল হাসান, করপোরাল মোখলেসুর রহমান, ল্যান্স করপোরাল রুহুল আমিন ও সিপাহি নুরুজ্জামানের ১০ বছর করে এবং এএসআই বজলুর রহমান ও হাবিলদার নাসির উদ্দিনের ৭ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে উচ্চ আদালতে। এদের মধ্যে মোখলেসুর রহমান ও কামাল হোসেন পলাতক।

২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর এ মামলার রায়ের প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। সেই আপিল এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য শুরু হয়নি শুনানি।


  বিষয়:   ১ যুগ  রায়  আপিল  শুনানি  নারায়ণগঞ্জ  সাত খুন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: