সিঙ্গাপুরের চকচকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে ঠিক সেই জলসীমায়ই নাটকীয়ভাবে ধরা পড়ে ইরানের তেল পাচারের এক বিশাল কারবার। মার্কিন নৌবাহিনী সম্প্রতি ‘এমটি টিফানি’ নামে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে। তার আগে পুরো এক বছর ধরে জাহাজটি ইরান ও মালয়েশিয়া উপকূলের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘুরপাক খেয়েছে; বারবার থেমেছে, এগিয়েছে, আবার অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সামুদ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর উপাত্ত বলছে, সেসব সফরে জাহাজটি প্রায়ই একটি ছোট্ট জায়গায় দীর্ঘক্ষণ নোঙর ফেলে রাখত। আর তখনই তারা তাদের বাধ্যতামূলক ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ (এআইএস) বন্ধ করে দিত। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর আবার সেটি চালু হতো। এমন আচরণের কারণ? ওই এলাকাটি আসলে ইরানের জন্য একটি ‘ভাসমান গ্যাস স্টেশন’। দেশটির ‘ছায়া নৌবহর’ সেখানে তেল কেনাবেচা ও মজুদ করে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরানি শাসনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাত।
ইওপিএল- ‘কাঁটা’ হয়ে ওঠা সেই অ্যাঙ্কোরেজ : আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস’ (ইওপিএল) অ্যাঙ্কোরেজ। অবস্থান বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ সিঙ্গাপুর প্রণালির ঠিক পূর্ব প্রবেশপথে। মালয়েশীয় উপদ্বীপের উপকূল থেকে প্রায় ৪৩ মাইল দূরে যা দেশটির নিজস্ব ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের’ ভেতরে পড়ে। আকারে প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের সমান। স্যাটেলাইট ছবিতে মাঝেমধ্যে এখানে শত শত জাহাজকে অলস ভাসতে দেখা যায়।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ফারজিন নাদিমির ভাষ্য, ‘সুবিধাজনক অবস্থান আর পার্শ্ববর্তী কর্তৃপক্ষের শিথিল মনোভাবের কারণেই ইওপিএল ছায়া নৌবহরের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। গোপন কার্যক্রমের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ মূলত অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে (বিষয়টি এড়িয়ে চলে)।’
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়া অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাদের জলসীমায় অবৈধ পণ্য স্থানান্তর বন্ধে কঠোর হবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামাদ হাসান স্বীকারও করেছিলেন, এটি তাদের জন্য একটি ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আর এমন কোনো দেশ হিসেবে অভিযুক্ত হতে চাই না যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সুবিধা দেয়।’
এক নজরে ইরানের তেল পাচার : যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান বিশ্বজুড়ে তেল বহনের জন্য বাধ্য হয় পুরোনো, অস্পষ্ট রেকর্ড ও অনিয়মিত বীমাসম্পন্ন ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভর করতে। এনার্জি ডাটা ফার্ম ‘ভরটেক্সা’র তথ্য বলছে, ইরানের ‘ছায়া নৌবহরের’ বেশিরভাগই ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ মানে এমটি টিফানির মতো বিশালাকার জাহাজ, যার ধারণক্ষমতা ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত।
এমন ঝুঁকি কেন : কারণ নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা এই তেল সাধারণত বিশ্ববাজারের মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’র চেয়ে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০ ডলার সস্তা। গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য হস্তান্তরের প্রতিটি চালান থেকে ইরানের সরকার আয় করছে কোটি কোটি ডলার। আর সেই অর্থের সিংহভাগ জোগাতেই ইওপিএল জোনটি পরিণত হয়েছে এক ভাসমান কৌশলগত ভান্ডারে।
কেমন চলে ‘কার্গো লন্ডারিং’ : বন্দরের ভিড় এড়াতে এবং পরিবহন দক্ষতা বাড়াতে ‘জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর’ শিপিংয়ের একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে এই কাজ অত্যন্ত কঠোর নিয়মের অধীন। উপকূলীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়, অনুমোদিত এলাকায় করতে হয়। ‘ছায়া নৌবহর’ কিন্তু তা মানে না। তাদের উদ্দেশ্য লজিস্টিক্যাল সুবিধা নয়, বরং তেলের প্রকৃত উৎস গোপন করা। তারা রাতের আঁধারে, এআইএস বন্ধ রেখে এই ‘লন্ডারিং’ চালায়। এমনকি জাহাজের গায়ে নতুন নাম, নতুন পতাকা এঁকে দেয়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের নাদিমি বলছেন, এটি মূলত একটি ‘কার্গো লন্ডারিং’ ব্যবসা। তারা নতুন কার্গো, নতুন জাহাজের জন্য নতুন গল্প তৈরি করে।
পুরো প্রক্রিয়াটি দুটি বহরে চলে। প্রথম বহর ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল সংগ্রহ করে ভারত মহাসাগর হয়ে মালয়েশিয়া উপকূলে নোঙর করে। দ্বিতীয় বহর সেখানে এসে সেই তেল নিজেদের ট্যাঙ্কারে তুলে নিয়ে চীনের শানডং প্রদেশের ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলোতে পৌঁছে দেয় যারা নিষেধাজ্ঞার তেল কেনার জন্য কুখ্যাত। কেপলারের বিশ্লেষক ইং কং লাহ জানান, চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানি তেল আমদানির কথা ঘোষণা করে না; বরং প্রায়ই সেটিকে ‘মালয়েশীয় তেল’ হিসেবে প্রচার করে।
কৌশলগত ভান্ডার : পারস্য উপসাগরে সংঘাতের আশঙ্কায় ইরান চায় তার অপরিশোধিত তেল মূল গ্রাহকদের (অর্থাৎ চীনের) যতটা সম্ভব কাছাকাছি নিয়ে আসতে। কেপলারের হিসাব অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের জন্য সাগরে রেকর্ড ১৯ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল মজুদ ছিলÑতার সিংহভাগই পূর্ব এশিয়ায়। এই ভাসমান মজুদের কারণেই মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার পরও ইরান চীনে প্রতিদিন গড়ে ১১ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি চালিয়ে যেতে পেরেছে।
এমটি টিফানির শেষ যাত্রা : মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার সময় এমটি টিফানি সম্ভবত ইওপিএল জোনের দিকেই যাচ্ছিল। জব্দের আগের মাসটি জাহাজটি কাটিয়েছিল হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর এলাকায়। ৬ এপ্রিলের স্যাটেলাইট ছবিতে জাহাজটিকে খার্গ দ্বীপে নোঙর অবস্থায় দেখা গেছে।
১০ এপ্রিল এটি ওমান উপসাগরে আবার এআইএস চালু করে, গন্তব্য সিঙ্গাপুর দেখিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রওনা দেয়। কিন্তু ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কা পেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই জাহাজটি তার গতিপথে ৯০ ডিগ্রি ঘুরে দক্ষিণমুখী হয়, তারপর আবার ৯০ ডিগ্রি ঘুরে পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করে। এই নাটকীয় কৌশলের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র জাহাজটি জব্দের ঘোষণা দেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের ভিডিওতে দেখা গেছেÑ হেলিকপ্টার মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে, মার্কিন কমান্ডো এমটি টিফানির ডেকে। জব্দের পর থেকে জাহাজটিকে ওই এলাকাতেই আটকে রাখা হয়েছে।
পরিসংখ্যানের চোখে : ২০২৫ সালে ইওপিএল জোনে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে ৬৭৯টি (২০২৪ সালে ছিল ৪৭১টি)। ইরানের দৈনিক তেল রফতানি ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল (২০২৫)। এর প্রায় ৯০ শতাংশ যায় চীনে। ইরানি তেলে ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার ছাড়ও মেলে।
একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ এই ইওপিএল অ্যাঙ্কোরেজ। বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউনের অনুমান, এখানে পণ্য স্থানান্তর করা জাহাজগুলোর ৯৫ শতাংশই চীনের উদ্দেশে ইরানি বা রুশ তেল পাচার করছে। আর যতদিন মালয়েশিয়া ‘অন্যদিকে তাকিয়ে’ থাকবে, সিঙ্গাপুরের মুখেই সাঁতার কাটতে থাকবে ইরানের ‘ভাসমান গ্যাস স্টেশন’।