জরায়ু সংক্রমণ, অবহেলায় বাড়ে ঝুঁকি

ডা. জিন্না তারা রুমি

ফিচার

হাসপাতালে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সি নারী রোগী আসেন তলপেটে ব্যথা, অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত রক্তস্রাব, জ্বর কিংবা সহবাসের সময় ব্যথার মতো

2026-04-28T05:05:07+00:00
2026-04-28T05:05:07+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
জরায়ু সংক্রমণ, অবহেলায় বাড়ে ঝুঁকি
ডা. জিন্না তারা রুমি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:০৫ এএম 
প্রতীকী ছবি
হাসপাতালে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সি নারী রোগী আসেন তলপেটে ব্যথা, অস্বাভাবিক সাদা স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত রক্তস্রাব, জ্বর কিংবা সহবাসের সময় ব্যথার মতো সমস্যা নিয়ে। অনেকেই প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়, তাদের অনেকেই জরায়ু সংক্রমণে ভুগছেন। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এই সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমনকি বন্ধ্যত্বের কারণও হতে পারে।
জরায়ু সংক্রমণ বা ইউটেরাইন ইনফেকশন হলো জরায়ু বা জরায়ুমুখে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ। অনেক সময় এটি যোনীপথ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে জরায়ু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। নারীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব, প্রসব-পরবর্তী অযত্ন, মাসিকের সময় অপরিচ্ছন্নতা কিংবা দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করানোর কারণে এই সংক্রমণ বাড়তে পারে। কারা বেশি আক্রান্ত হন আমার অভিজ্ঞতায়, কিছু নারী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যেমন-

সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন এমন মায়েরা
সিজারের পর নারীরা
যারা মাসিকের সময় অপরিচ্ছন্ন কাপড় ব্যবহার করেন
যারা দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করেন

বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের নারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাবে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেকেই লজ্জায় বিষয়টি গোপন রাখেন, ফলে রোগ জটিল হয়।

প্রসবের পর জরায়ু সংক্রমণ

প্রসবের পর জরায়ু সংক্রমণ খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। নরমাল ডেলিভারি বা সিজারের পর যদি যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা হয়, তা হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রসবের পর যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে

দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র তলপেট ব্যথা, জ্বর ও কাঁপুনি, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অবহেলা করলে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে গিয়ে সেপসিস পর্যন্ত হতে পারে।

অপরিচ্ছন্নতা থেকেই বাড়ছে ঝুঁকি 

আমাদের দেশে এখনও অনেক নারী মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন, যা ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। আবার কেউ কেউ দীর্ঘসময় প্যাড পরিবর্তন করেন না। অপরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার কিংবা ভেজা অন্তর্বাস দীর্ঘক্ষণ পরে থাকাও সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

আমি সবসময় রোগীদের বলি, মাসিকের সময় অন্তত ৪-৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড বদলাতে হবে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

জরায়ু সংক্রমণ ও বন্ধ্যত্বের সম্পর্ক

দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ জরায়ু থেকে ফ্যালোপিয়ান টিউব পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এতে টিউব ব্লক হয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির ঝুঁকিও বেড়ে যায়। অনেক রোগী আমার কাছে আসেন সন্তান না হওয়ার অভিযোগ নিয়ে। পরীক্ষা করে দেখা যায়, পুরোনো সংক্রমণের কারণে টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জরায়ু সংক্রমণ নাকি জরায়ুমুখ ক্যানসার

অনেক সময় জরায়ু সংক্রমণ ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের কিছু লক্ষণ একই রকম হয়। যেমন- অস্বাভাবিক রক্তস্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, সহবাসের পর রক্তপাত ও তলপেটে ব্যথা।

তাই শুধু ওষুধ খেয়ে বসে থাকলে হবে না। প্রয়োজন হলে প্যাপ স্মিয়ার, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হবে।

নারীদের লজ্জায় লুকানো কষ্ট

গ্রামের অনেক নারী এই সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চান না। তারা মনে করেন এটি লজ্জার বিষয়। ফলে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে সাময়িক উপশম নেন। এতে রোগ আরও জটিল হয়ে ওঠে। নারীদের বোঝাতে হবে, জরায়ু সংক্রমণ কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ।

প্রতিরোধে করণীয়

জরায়ু সংক্রমণ প্রতিরোধে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলতে হবে

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
মাসিকের সময় নিয়মিত প্যাড পরিবর্তন করা
অপরিচ্ছন্ন কাপড় ব্যবহার না করা
নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা
প্রসবের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
অস্বাভাবিক স্রাব, ব্যথা বা জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া

নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে পরিবারকেও এগিয়ে আসতে হবে। কারণ অবহেলা করলে জরায়ু সংক্রমণ নীরব ঘাতকের মতো শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে যেতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। মনে রাখবেন, লজ্জা নয়, সচেতনতাই পারে নারীর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে। 

লেখক : সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন হাসপাতাল


  বিষয়:   হাসপাতাল  নারী  রোগী  জরায়ু  সংক্রমণ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: