হরমুজে রাশিয়ার প্রমোদতরী, যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা

তৌহিদুজ্জামান সোহান

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানি আর হরমুজ প্রণালিতে কঠোর সামরিক অবরোধকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে বীরদর্পে প্রণালিটির নীল জলরাশি পেরিয়েছে রাশিয়ার এক বিলাসবহুল প্রমোদতরী।

2026-04-29T00:38:08+00:00
2026-04-29T00:43:46+00:00
 
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হরমুজে রাশিয়ার প্রমোদতরী, যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৮ এএম  আপডেট: ২৯.০৪.২০২৬ ১২:৪৩ এএম
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানি আর হরমুজ প্রণালিতে কঠোর সামরিক অবরোধকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে বীরদর্পে প্রণালিটির নীল জলরাশি পেরিয়েছে রাশিয়ার এক বিলাসবহুল প্রমোদতরী। বিবিসি বলছে, পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রুশ কোটিপতি আলেক্সেই মর্দাশভের মালিকানাধীন ‘নর্ড’ জাহাজটি সম্প্রতি উত্তেজনার তুঙ্গে থাকা এই কৌশলগত জলপথটি পাড়ি দেয়। অথচ বিশ্বের অন্য বেসরকারি জাহাজগুলো এখন আতঙ্কে হরমুজের কাছে ঘেঁষছে না। মার্কিন পক্ষ থেকে জাহাজ আটকের খবর আসছে হরদম। জাহাজে হামলা কিংবা জব্দে পিছিয়ে নেই ইরানি সেনারাও। এমন সময় প্রণালিতে নর্ডের প্রবেশ আপাতদৃষ্টিতে একটিই বিলাসবহুল জাহাজের পদচারণ মনে হলেও কিন্তু কূটনীতির পর্দার আড়ালে এর গুরুত্ব অনেক। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘মোড়লগিরির’ বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পরোয়ানাভঙ্গের এক সাহসী বার্তা। এটি যেমন মস্কো-তেহরান অক্ষের নতুন দৃঢ়তার প্রমাণ তেমনি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পশ্চিমা শক্তি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার এক বাস্তব চিত্র।

অবরোধ ফাঁকি, নাকি কূটনৈতিক তোপ

হরমুজ প্রণালি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে টানাপোড়েন চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর তেহরান পাল্টা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল সীমাবদ্ধ করে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পারাপারের এই পথ বন্ধ থাকায় জ্বালানি বাজারে শুরু হয়েছে তাণ্ডব। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছুঁয়ে গেছে ১০৯ ডলার। এই উত্তেজনার মধ্যেই রুশ পতাকা উড়িয়ে দুবাই থেকে ওমান যাওয়ার পথে বীরদর্পে প্রণালিটি পাড়ি দিয়েছে প্রমোদতরী নর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, ইরানের বাধা, হামলা বা জব্দের আতঙ্ক কোনো কিছুই পরোয়া করেনি এই রুশ প্রমোদতরী।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন... কেন এই সময়ে, কেন এই পথে? বিবিসির হ্যারি সেকুলিক লিখেছেন, পুতিনের কৌশল পরিষ্কার। তিনি দেখাতে চান, আমেরিকা যতই অবরোধ আরোপ করুক না কেন, রাশিয়া তার ইচ্ছামতো চলবে। হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সামুদ্রিক রুট নয়; এটি ভূরাজনীতির রণাঙ্গন। এখানে আবরোধের মধ্যে রুশ পতাকা ওড়ানো মানে ‘আমি তোমার নিষেধাজ্ঞাকে গ্রাহ্যই করছি না।’

ইরান-রাশিয়া অক্ষ ও কূটনীতির নতুন মোড়

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর কূটনৈতিক পটভূমি। ‘নর্ড’ যখন প্রণালি পার হচ্ছে, তখন সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিন ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আলাপ করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলছেন, ‘আমাদের সম্পর্ক কৌশলগত এবং গভীর।’ পুতিনও আরাঘচিকে সুগভীর বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘ইরানি জনগণ সাহসিকতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপ মোকাবিলা করছে।’ ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম, রাশিয়ার ওপর ইরানের মতো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি কূটনৈতিক সাদৃশ্যতা দুই দেশকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে।

প্রতিবেদক হ্যারি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বে সরাসরি ঢুকে পড়ছে রাশিয়া। তাও আবার এমন এক জাহাজ দিয়ে যার মালিক পুতিনের সর্বক্ষণের সঙ্গী। তা হলে রাশিয়া কি ইচ্ছা করেই দেখাচ্ছে যে, ‘আমরা ইরানের পাশে আছি’? 

মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি এবং ন্যাশনাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি ‘হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্স’-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভিজিটিং শিক্ষক মুরাদ সাদিগজাদে মনে করেন, রুশ জাহাজ চলাচলের বেলায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হবে না। এটি ইরানের ‘সিলেক্টিভ ভূরাজনীতি’। প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জলপথ হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইরান সিদ্ধান্ত নেয় কে চলাচল করতে পারবে, আর কে পারবে না। রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের গভীর কৌশলগত সম্পর্কের কারণেই মর্দাশভের জাহাজটি কেবল নির্বিঘ্নেই চলাচল করেনি, বরং পশ্চিমের নেতাদের এক কূটনৈতিক সংকেতও দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান রুশ পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য কাস্পিয়ান সাগরীয় পথে নিজেদের নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এমন সময় হরমুজে রুশ অলিগার্কের ইয়ট চলাচল মানে হলো পশ্চিমা যেকোনো নিষেধাজ্ঞাই রাশিয়া ও ইরান পরস্পরের সহায়তায় ভেস্তে দিতে পারে।

পুতিন মিত্র মর্দাশভ ও প্রমোদতরী ‘নর্ড’ 

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, মর্দাশভ বিলাসবহুল প্রমোদতরীটির আনুষ্ঠানিক মালিক নন। জাহাজটি তার স্ত্রীর ফার্মের নামে নিবন্ধিত। আসলে এটা নিষেধাজ্ঞা ফাঁকির পুরোনো ফর্মুলা। পশ্চিমা দেশগুলো বারবার এই জাহাজকে বাজেয়াপ্ত করার পাঁয়তারা করেছে। কিন্তু এর আগেও হংকং, মালদ্বীপ জাহাজটি আটকের ব্যাপারে পাত্তা দেয়নি। এবার ‘নর্ড’ হরমুজ পাড়ি দিয়ে দেখিয়ে দিল, অলিগার্ক তথা ধনিক শ্রেণি ও তাদের সম্পদ কোনো ‘আইন-কানুনের’ বেড়ায় আটকায় না।

আলিশান এই প্রমোদতরীর মূল্য ৫০ কোটি ডলারের বেশি। কিন্তু মূল্যের চেয়েও বড় ব্যাপার হলো এই ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্য। যখন জাহাজটি প্রণালি পার হচ্ছে, রাশিয়া তখন চলমান সংঘাতে ইরানের ‘শক্তি ও সাহসের’ প্রশংসা করছে। আর এই দুয়ের মাঝে সমন্বয় নেহাত কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়।

গণমাধ্যম ও জনমনে বার্তা

কীভাবে প্রতীকী ঘটনা ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান মজবুত করতে হয় তা ভালোই বোঝেন রুশ নেতা পুতিন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘নর্ড’ পারাপার সেই প্রতীকী কর্মকাণ্ড। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দেওয়া একটি স্পষ্ট বার্তা; তা হলো, তোমরা যতই চাপাচাপি করো, আমরা মানছি না। আমাদের জন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। থমকে যাওয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনার ফাঁকে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে কৌশলগত বোঝাপড়া গড়ে উঠছে। চীন-ইরান-রাশিয়া অক্ষের কথাও নতুন করে ভাবাচ্ছে পশ্চিমাদের। ‘নর্ড’ যেন সেই অক্ষের একটি ভাসমান প্রতীক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভূরাজনীতিতে শুধু যুদ্ধ-সন্ধি নয়, কখনো কখনো একটি বিলাসবহুল ইয়টের পদচারণও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে অথবা অন্ততপক্ষে শক্তির নতুন সমীকরণ লিখে দিতে পারে। পুতিনের ‘থোড়াই কেয়ার’ মনোভাবের কাছে আমেরিকার ‘মোড়লগিরি’ কতটা কার্যকর, সেই পরীক্ষাই যেন নেওয়া হলো নর্ডকে হরমুজ প্রণালি পার করে। প্রমোদতরীটি এখন ওমানের আল মউজ মেরিনায় বন্দরে নোঙর ফেলে অলস বসে আছে। এর পরবর্তী গন্তব্য কোথায় তা অজানা। তবে এটা নিশ্চিত, ‘পশ্চিমা মোড়লদের’ কাছে পুতিনের শক্ত বার্তা পৌঁছে গেছে।

রুশ সামরিক বিশ্লেষক এবং হরমুজ প্রণালির গতিপথ ও ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইউরি নুতভের মতে, এই ঘটনা আমেরিকার সামনে এক বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বোঝে, ইরানের হাতে এখন বেশ ক্ষমতা রয়েছে। তারা শুধু প্রণালি বন্ধই রাখতে পারে না, বরং হুথিদের দিয়ে বাব এল মান্দেব প্রণালিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থায় রাশিয়াকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অংশীদার’ হিসেবে দেখানো ইরানের নিজস্ব কৌশল।

তিনি আরও যুক্ত করেন, মর্দাশভের ইয়টকে আসলে একটি পাইলট প্রকল্প বলেই দেখা যায়। ইরান পরীক্ষা করে দেখল, আমেরিকা বা ইসরাইল এই রুশ ইয়ট আটকায় কি না। আগামী দিনে আরও রুশ বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করবে, যা আমেরিকার অবরোধকে কার্যত অর্থহীন করে দেবে।


  বিষয়:   হরমুজ  রাশিয়া  প্রমোদতরী  যুক্তরাষ্ট্র 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: