পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট আজ সম্পন্ন হলো। বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তির ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে দিনটি শান্তিপূর্ণভাবেই কাটে। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের দ্বিতীয় দফায় কার্যত জনবিস্ফোরণের ছবি দেখা গেল বাংলায়। জানা গেছে, ভোটের ফলাফল ঘোষণা হবে আগামী ৪ মে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর ১টা পর্যন্ত রাজ্যের ১৪২টি আসনে ভোটদানের হার দাঁড়ায় ৬১.১১ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটারদের বুথমুখী হওয়ার প্রবণতা ছিল অনেক বেশি। যদিও এই হার প্রথম দফার তুলনায় সামান্য কম, তবে লোকসভা নির্বাচনের যেকোনও দফার সর্বোচ্চ পরিসংখ্যানকে অনায়াসে ছাপিয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের এই উৎসবের মাঝেই দিনভর উত্তপ্ত ছিল তিলোত্তমা কলকাতা। ভবানীপুরে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী ও তৃণমূল প্রার্থী কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের জেরে কালীঘাট চত্বর রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি, ‘চোর’ স্লোগান এবং পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে লাঠিচার্জ— সব মিলিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়।
অশান্তির আঁচ ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে— পানিহাটি, চুঁচুড়া, বাসন্তী-সহ একাধিক এলাকায়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় মোট ৩ কোটি ২১ লক্ষ ৭৫ হাজার ২৯৯ জন ভোটার অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬৪ লক্ষ পুরুষ এবং ১ কোটি ৫৭ লক্ষের বেশি নারী ভোটার রয়েছেন।
আয়তনের নিরিখে কলকাতার জোড়াসাঁকো ছিল সবচেয়ে ছোট কেন্দ্র, আর ভোটারের সংখ্যার বিচারে হুগলির চুঁচুড়া ছিল বৃহত্তম।
চিরাচরিত রেওয়াজ ভেঙে এদিন সকাল থেকেই বুথ পরিদর্শনে বের হন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাধারণত ভোটের দিনে তিনি কালীঘাটের বাড়িতেই থাকেন, তবে এদিন চেতলা ও চক্রবেড়িয়ার বিভিন্ন বুথে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
কেন্দ্রীয় বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, আগের রাত থেকেই তিনি পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বাহিনী মাঝরাতে নেতাদের বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে এবং পুলিশ পর্যবেক্ষকরা তৃণমূলের এজেন্টদের গ্রেফতারের জন্য চাপ দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, “বাইরে থেকে আসা অনেক পুলিশ অফিসার বাংলাকে বোঝেন না এবং তারা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন।”
অন্যদিকে, সকাল থেকেই ভবানীপুরে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভোট পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “এই বুথেও আমি জিতব। ৮০ শতাংশ ভোট পড়লে জয় নিশ্চিত, ৯০ শতাংশ হলে বড় ব্যবধানে জিতব।”
তবে পরে কালীঘাটে তাঁর কনভয় পৌঁছালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৃণমূল কর্মীদের ‘চোর-চোর’ স্লোগান ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ‘জয় বাংলা’ বনাম ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানে এলাকা সরগরম হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাহিনী লাঠিচার্জ করলে শুভেন্দুকে উত্তেজিত অবস্থায় প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়। পরে তিনি মন্তব্য করেন, ভবানীপুর ভদ্রলোকদের জায়গা, এখানে ছোটলোকদের স্থান নেই।
জেলাভিত্তিক ভোটে পূর্ব বর্ধমান আবারও নজর কাড়ে। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
দুপুর ১টা পর্যন্ত এই জেলার ভোটদানের হার রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। গলসি ও মন্তেশ্বর কেন্দ্রে সকাল থেকেই দ্রুত ভোটগ্রহণ শুরু হয়— সকাল ১১টা নাগাদ যথাক্রমে ৪৭.৮৬% ও ৪৬.৮৩% ভোট পড়ে, যা দক্ষিণ কলকাতার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
নদিয়ার চাপড়ায় এক তৃণমূল এজেন্টকে ভোটার প্রভাবিত করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পানিহাটিতে আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ হয়। চুঁচুড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনটি রাজনৈতিক দলের ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে।
ভাঙড়ে আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকীকে ঘিরে তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। বাসন্তীতে তৃণমূল কর্মীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকুলতলায় শিবির ভাঙার প্রতিবাদে উত্তেজনা ছড়ায়।
ভোটের মাঝে কিছু আবেগঘন ছবিও সামনে আসে। দমদম উত্তরের বাম প্রার্থী দীপ্সিতা ধর ভোট দিয়ে মানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। অন্যদিকে, কালীগঞ্জের সিপিএম প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন তাঁর প্রয়াত কন্যার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগের বার মেয়ের হাত ধরে বুথে গিয়েছিলাম, আজ সে নেই— শুধু স্মৃতি নিয়েই লড়ছি।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় দফার এই নির্বাচন একদিকে যেমন বিপুল জনউৎসাহ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ছবি তুলে ধরেছে, তেমনই অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনাও স্পষ্ট করেছে।
/ইউএমএইচ