মধ্যপ্রাচ্য বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, অস্থিরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ছবি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন থেকে শুরু করে ইয়েমেন পর্যন্ত যে অশান্তি আমরা দেখছি, তার শিকড় আসলে অনেক গভীরে প্রোথিত।
এসবের মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে নতুন এক মধ্যপ্রাচ্যের ধারণা, যা মূলত একটি বিতর্কিত ভূরাজনৈতিক ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে অঞ্চলটির সীমানা ও রাজনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা নির্দেশ করে এই ধারণা। ইরাক যুদ্ধের সময় ২০০৬ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস এই ধারণাটি প্রকাশ্যে আনেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পরিস্থিতিতে এটিকে ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব খর্ব করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষক ওসামা আল-শরিফের মতে, নয়া মধ্যপ্রাচ্য ধারণাটি ‘সাইকস-পিকট চক্রান্তের চেয়েও ভয়াবহ এক বাস্তবতা’। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ জোসেফ বাহাউতের ভাষায়, উপসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে ধ্বংসস্তূপের নিচে নতুন এক মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখার সন্ধান করছে।
অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও ইউরোপীয় প্রভাব : শত শত বছর ধরে অটোমান সাম্রাজ্য এই অঞ্চলটি শাসন করে আসছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশরা ভারতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা সুগম করতে সুয়েজ খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অটোমানরা জার্মানির পক্ষ নেয়। তার ফলে ব্রিটিশ ও ফরাসি শক্তি এই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পায় এবং গোপনে ছক কষতে থাকে।
সাইকস-পিকট চুক্তি ও মানচিত্রের কাটাছেঁড়া : আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সাইকস-পিকট চুক্তি। ১৯১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স অত্যন্ত গোপনে অটোমানদের শাসনাধীন আরব ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। একদিকে আরবদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, অন্যদিকে ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাস’ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতিই আজকের দিনে বহু সংকটের মূল কারণ।
১৯২৩ সালের লোজান চুক্তির মাধ্যমে বর্তমানের সীমান্তগুলো একরকম চূড়ান্ত রূপ পায়, যা কুর্দিদের মতো অনেক জাতিকে রাষ্ট্রহীন করে ফেলে। অধ্যাপক হান্স-লুকাস কিজার তার ‘হোয়েন ডেমোক্র্যাসি ডায়েড’ গ্রন্থে দেখান, কীভাবে ১৯২৩ সালের লোজান চুক্তি কেবল তুরস্কের সীমানাই তৈরি করেনি বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন জাতিরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো ও নাগরিকত্বের ধারণাও নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
কিজার বলেন, চুক্তিটি বাধ্যতামূলকভাবে সংখ্যালঘু ‘জনসংখ্যা বিনিময়ের’ মাধ্যমে একটি সমজাতীয় তুর্কি রাষ্ট্রের পক্ষে ছিল; যা আর্মেনীয়, কুর্দি ও আরবদের মতো গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালানোর ভিত্তি তৈরি করে। অন্য এক ইতিহাসবিদ মিশেল তুসান তার ‘দ্য লাস্ট ট্রিটি’ গ্রন্থে যুক্তি দেন, যতক্ষণ না লোজান চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত হয় ততদিন সত্যিকার অর্থে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষই হয়নি। এটি ছিল মূলত এক সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধ।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ ও নাকবা এবং এক নতুন ইতিহাস : ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিভাগ পরিকল্পনা এবং ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন, যাকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় বলে অভিহিত করে। এটি কেবল একটি ভূখণ্ডের লড়াই ছিল না বরং এটি ছিল আরব জাতীয়তাবাদ এবং জায়নবাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সূচনা। ইসরাইলি ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ইলান পাপ্পের মতে, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল না বরং একটি সুপরিকল্পিত ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান ছিল। তিনি যুক্তি দেন, ইহুদিবাদী নেতৃত্ব পূর্বপরিকল্পিতভাবেই ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করেছিল।
ইরান, সৌদি আরব ও ইসরাইলের নয়া মেরুকরণ : বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তাদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা (আব্রাহাম অ্যাকর্ডস) অঞ্চলটি নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ডেভিড মাকোভস্কির মতে, ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি আরব-ইসরাইল সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গোপন সমন্বয় বৃদ্ধি পেয়েছে। জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তেহরানের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের ভয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে দেখছে।
তবে ড. ওফির হাইভ্রির মতো সমালোচকরা এই মৈত্রীকে ‘অনির্ভরযোগ্য’ ও বিপজ্জনক বলে মনে করেন। কারণ তাদের মতে এই সম্পর্ক স্বল্পমেয়াদি ও ভঙ্গুর।
২০২৩ সালে শুরু গাজা যুদ্ধ ও পাল্টে যাওয়া সমীকরণ : ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের নজিরবিহীন হামলা ইসরাইলের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশলের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়। এরপর ইসরাইল গাজায় সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করে, যা ইরানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়ায়।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেনেভ আবদোর মতে, এই যুদ্ধের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো, বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনি ইস্যু উপেক্ষা করার কৌশল ছিল অবাস্তব ও অস্থিতিশীল। অন্যদিকে সিনিয়র ইসরাইল বিশ্লেষক মাইরাভ জোনসিন এবং সংঘাত নিরসন বিশেষজ্ঞ রান্ডা স্লিমের মতো বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং এর সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা নিছক কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি গত শতাব্দীর ঔপনিবেশিক উচ্চাকাক্সক্ষা, চাপিয়ে দেওয়া সীমানা এবং জাতিগত-ধর্মীয় সংঘাতেরই ধারাবাহিকতা। ইতিহাস বলে, এখানকার সীমানাগুলো কলমের কালিতে আঁকা হলেও তা বারবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আজও একটি ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/আআ