মে মাসের প্রথম দিনটি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মহান মে দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি সরকারি ছুটির দিন।
১৮৮৬ সালের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে ১১ জন শ্রমিক নিহত হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি কেন করা হয়েছিল? কারণ সে সময়ে শ্রমিকদের প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কিংবা তার চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে হতো। কিন্তু সে অনুযায়ী মজুরি মিলত না। ফলে শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি জোরদার হয়। মালিক পক্ষ ওই দাবি মেনে না নিয়ে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়। পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক নিহত হওয়া ছাড়াও বেশকিছু শ্রমিকের জেল হয়।
পুলিশ হত্যার মিথ্যা অভিযোগে অগাস্ট স্পিজ নামের এক শ্রমিকের ফাঁসি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দাবি ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়।
শ্রমজীবী মানুষের আত্মদানের সেই গৌরবময় দিনটিকে স্মরণ করে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছর মে মাসের প্রথম দিনটি ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সোশ্যালিস্ট কংগ্রেসে পহেলা মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তখন থেকে বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। রাশিয়াসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হলে মে দিবস এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও প্রতিষ্ঠিত হয়। আইএলও শ্রমিকদের অধিকারগুলোর স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতির ফলে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে কিছু আইনগত বিষয় মেনে চলার নৈতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। এতে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের স্বার্থ ও অধিকার সংরক্ষিত হয়। বাংলাদেশ আইএলও সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। ফলে বাংলাদেশেও বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মহান মে দিবস পালিত হয়।
শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মাহুতি দানকারী শ্রমিককদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার জন্য এই দিবসটি শুধু পালন বা উদযাপন করাই যথেষ্ট নয়। এই দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের পেশাগত ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু এক সময়ে শ্রমিকদের কোনো কর্মঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেশিরভাগ সময় শ্রমিকদের কারখানায় বা কর্মস্থলে কাজ করতে হতো। এই দীর্ঘ সময় কর্মে নিয়োজিত রেখেও কখনো কখনো শ্রমিকদের ওপর চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কিন্তু জগতের কোনো শোষণ-নির্যাতন কখনো স্থায়ীভাবে চলতে পারে না, তাই শ্রমিকদের প্রতি মালিক পক্ষের এই নির্মম অমানবিক আচরণও দীর্ঘদিন চলতে পারেনি।
নির্যাতিত শ্রমজীবী মানুষ এক সময় জীবনকে তুচ্ছ করে শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সেই রুখে দাঁড়ানোর দিনটি ছিল ১৮৮৬ সালের ১ মে। ওই দিন শ্রমজীবী মানুষ ঘাম নয়, রক্তের বিনিময়ে আদায় করেছে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার। পহেলা মের সেই আত্মদানের বিনিময়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের জন্য দৈনিক কর্মসময় ৮ ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে। সেই আত্মদানের বিনিময়ে বর্তমান বিশ্বে শ্রমজীবী মানুষ ৮ ঘণ্টা কাজ করে পুরো দিনের মজুরি পাচ্ছে।
এই যে শ্রমঘণ্টা কমেছে, তাতেই কি শ্রমজীবী মানুষের সব অধিকার আদায় হয়ে গেছে? হয়নি। কারণ শ্রমিক অধিকার বলতে কেবল শ্রমঘণ্টার যৌক্তিকীকরণ বোঝায় না। শ্রমিক অধিকারের সঙ্গে অতি অবশ্যই যুক্ত থাকে ন্যায্য মজুরি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা ও মালিক পক্ষের মানবিক আচরণ। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সামগ্রিকভাবে এসব বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে।
শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সমিতিগুলো নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। বর্তমানে এ শ্রমিক সমিতিগুলো কতটা শ্রমিকবান্ধব সেটাও খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে, শ্রমিক নেতারা এখন মালিক ও শ্রমিক– দুই শ্রেণিকেই শোষণ করছে।
যাহোক, শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা বলতে গেলে প্রথমেই ন্যায্য মজুরির কথা বলতে হয়। স্বীকার করতে হবে যে, ন্যায্য মজুরি একটি আপেক্ষিক বিষয়। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর মজুরির বিষয়টি নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকে। জীবনযাত্রার ব্যয় শহরাঞ্চলে যতটা গ্রামাঞ্চলে ততটা নয়। তাই শহরের শিল্প শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামের কৃষি শ্রমিকদের মজুরির পার্থক্য হতে পারে। লিঙ্গভেদে মজুরির পার্থক্য অন্যায় ও অমানবিক। কর্মস্থল, কাজের ধরন ও কর্মঘণ্টা সমান হলে পুরুষ শ্রমিক ও নারী শ্রমিকের মজুরির পার্থক্য হতে পারে না। মজুরির ক্ষেত্রে এই লিঙ্গবৈষম্যের কথা প্রায়ই শোনা যায়। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিশু শ্রমিক সমস্যা আর একটি প্রকট বিষয়। বাংলাদেশে শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ। তাই সব শিশু শ্রমিককে কারখানা বা কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করে স্কুলমুখী করা উচিত। শিশুরা যেন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সে ব্যাপারে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। অনিবার্য কারণে যেসব শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত তাদের জন্য সীমিত সময় কাজ করা এবং কাজের ধরন শিশু উপযোগী রাখা এবং শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য কর্মস্থলে শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখনও অনেক শিশু শ্রমিক বিভিন্ন কল-কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। এ ধরনের শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের অবমুক্ত করে শিক্ষার আওতায় আনা জরুরি।
আমাদের দেশে তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারী শ্রমিক কাজ করে। এ শিল্পে এখনও পুরুষ ও নারী শ্রমিকের
বেতনবৈষম্য দূর হয়নি। অন্যান্য মিল-কারখানায়ও নারী ও পুরুষ শ্রমিকের বেতনবৈষম্য বিদ্যমান আছে। বেতনবৃদ্ধির বিষয়টিও সন্তোষজনক নয়। মাঝে মাঝে শ্রমিকদের বেতনবৃদ্ধির বিষয়টি লক্ষ করা গেলেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি অনুসারে নির্ধারণ করা হয় না।
তা ছাড়া ছুটি, অনুপস্থিতি– ইত্যাদির বরাত দিয়ে বেতন কর্তনের নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। কল-কারখানায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ মালিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিভিন্ন নিয়ম প্রণয়নের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের শোষণ ও নির্যাতন করে থাকে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা একদিকে মালিক পক্ষের নিকট থেকে সুবিধা নেয়, অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে সাধারণ শ্রমিকদের শোষণ করে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এখন এক ধরনের চাঁদাবাজ সংগঠনের পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ শোনা যায়। সংগঠনগুলো শ্রমিকদের কাছে থেকে যে চাঁদা আদায় করে অনেক ক্ষেত্রেই তার কোনো হিসাব থাকে না। সাধারণ শ্রমিকরা হিসেব চাইতেও পারে না। কারণ শ্রমিক সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা প্রভাবশালী এবং কেতাবে শ্রমিক হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে পেশিশক্তির অধিকারী। তা হলে তো বলাই যায়, মালিকদের পাশাপাশি এখন শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমেও শ্রমিক শোষণ চলছে। এ ধরনের শোষণের হাত থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করা জরুরি।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আর একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা। কর্মস্থলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা কতটুকু? এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে হতাশ হতে হয়। অধিকাংশ কারখানার চতুর্দিকে নেই কোনো খালি জায়গা। গায়ে গায়ে লেগে থাকা বহুতল ভবনগুলোতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তৈরি পোশাক কারখানা। এসব ভবনের নেই কোনো প্রশস্ত সিঁড়ি, নেই পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা। ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডে নেই কোনো দ্রুত নির্গমন ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবে শ্রমিকের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে দিন দিন। বিদ্যমান কর্মপরিবেশ মহিলা শ্রমিকের জন্য আরও ভয়াবহ ও বিপজ্জনক।
শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারী শ্রমিকের শিশুসন্তানদের জন্য অনেক কারখানায় নেই ডে-কেয়ার সেন্টার বা দিবা পরিচর্যা কেন্দ্র। একজন শ্রমিক তার কর্মস্থলে নিরাপদে কাজ করবে এটা তার অধিকার। পাশাপাশি মালিক পক্ষের কাছ থেকে মানবিক আচরণ পাওয়াও শ্রমিকের অধিকার। তাই শ্রমিকের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ তাদের অধিকার হরণের শামিল।
মানবতাবাদী বিশ্বে শ্রমিকরা অমানবিক আচরণের শিকার হতে পারেন না। মহিলা শ্রমিকগণ সাধারণত কর্মস্থলে সবচেয়ে বেশি অসদাচরণের শিকার হন। তাদের বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর কথা বলে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয় সারাক্ষণ নারী শ্রমিকদের তাড়া করে বেড়ায়। এ সবকিছুর নিরসন হোক মে দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক ও গবেষক
এফআর