কোমরে ধানের আঁটি বেঁধে খেতের আইল ধরে হেঁটে আসছেন কৃষাণী পারভীন আক্তার। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা। চারদিকে জমে থাকা পানি, নুয়ে পড়া পাকা ধান—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চয়তার দৃশ্য। তিনি বলছিলেন, খেতে ধান পচতাছে, সারাবছর কী খামু? কিছু যদি ঘরে তুলতে পারি…এই আর্তি যেন এখন ত্রিশালের হাজারো কৃষক পরিবারেরই কণ্ঠস্বর।
শুক্রবার (১ মে) সকালে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ী ইউনিয়নের একটি গ্রামে দেখা এই দৃশ্য এখন পুরো উপজেলার কৃষি পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি। বোরো ধান কাটার মৌসুমে টানা বৈরী আবহাওয়া ও তীব্র শ্রমিক সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ফলে অনেক খেতেই পাকা ধান সময়মতো কাটতে না পেরে জমিতেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ত্রিশালে ১৯ হাজার ৯৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে থাকা ১১টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা ও মাড়াই কার্যক্রম চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
এদিকে এলাকায় টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। কয়েকদিন ধরে সূর্যের দেখা না মেলায় জমিতে পানি জমে থাকছে, যা পাকা ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে সকালে কিছুটা রোদের দেখা মেলায় কৃষকদের মাঝে সাময়িক স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকে সকাল থেকেই দ্রুত ধান কাটার কাজে নেমে পড়েছেন। জমিতে জমে থাকা পানি কিছুটা শুকাতে শুরু করায় ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা জোরদার হয়েছে। কৃষকদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অন্তত আংশিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দিনমজুর শ্রমিকের মজুরি এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে নতুন ধানের বাজারদর মনপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
মঠবাড়ী ইউনিয়নের অলহরী গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, ধান কেটে আইলে রাখছি, কিন্তু শ্রমিকের অভাবে ঘরে তুলতে পারতেছি না। আজ রোদ উঠছে, তাই তাড়াহুড়া কইরা কাজ করতেছি।
আরেক কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, ধানের দাম কম, শ্রমিকের মজুরি বেশি—এই অবস্থায় ধান কেটে লাভ তো নাই, উল্টো লোকসান। তাই দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক পরিবারে নারী সদস্যরাও এখন মাঠে নেমে পড়েছেন। পারভীন আক্তারের মতো গৃহিণীরা কোমরে ধানের আঁটি বেঁধে খেত থেকে ধান সরিয়ে নিচ্ছেন, যাতে অন্তত কিছু ফসল রক্ষা করা যায়।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রমিক মজুরির পাশাপাশি সেচ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দামও বেড়েছে, যা সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। তবে সেই তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম থাকায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ত্রিশাল উপজেলা কৃষি অফিসের ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার জন্য যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় রোদ থাকা সময়টুকু কাজে লাগিয়ে দ্রুত ফসল ঘরে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বৈরী আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরির ত্রিমুখী চাপে ত্রিশালের কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তবে আজকের সামান্য রোদ কিছুটা আশার আলো দেখালেও, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে মাঠের পাকা ধান ঘরে তোলা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/জোই