মাকালু অভিযানে বাবর আলী। ছবি : ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স
আজ ভোরে বাবর নিজেকে নিয়ে গেলেন আরেক ধাপ উচ্চতায়। পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচটি জয় করলেন তিনি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই ১৪টি পর্বত চূড়ার মধ্যে ৪টি পর্বতের চূড়া ছুঁয়েছেন পর্বতারোহী বাবর আলী, যে কৃতিত্ব আর কোনো বাংলাদেশির নেই।
শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি নিজের পঞ্চম আটহাজারি পর্বত হিসেবে স্পর্শ করেছেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু শিখর।
নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম বাংলাদেশি সফলতা। ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’।
ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান নেপালের আউটফিটার ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’ এর স্বত্বাধিকারী মোহন লামসাল এর সূত্রে সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পঞ্চম আটহাজারি পর্বত জয় করলেন তিনি। ছবি : ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স
শিখরে বাবরের সাথে ছিলেন আং কামি শেরপা। বাবরের এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ভিজুয়াল নিটওয়ারস লিমিটেড, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং রহমান্স গ্রোসারিজ।
‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ খ্যাত এই চূড়া আরোহণের উদ্দেশ্যে বাবর ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি শেষে তিনি ৯ এপ্রিল বিমানে উড়ে যান টুমলিংটার এবং সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে।
এরপর পায়ে চলা শুরু করে ১৮ এপ্রিল পৌঁছান পর্বতের উচ্চতর বেস ক্যাম্পে। এরপর উচ্চতার সাথে শরীরকে মানিয়ে নিতে ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ ও পরদিন ক্যাম্প-২ তে ঘুমিয়ে ৭,০০০ মিটার উচ্চতা ছুঁয়ে বেসক্যাম্পে নেমে আসেন।
দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল তিনি পর্বতে চড়ে ক্যাম্প-২ এ একদিন কাটিয়ে পরদিন নেমে আসেন বেসক্যাম্পে। এরপর শুরু হয় ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষার পালা।
আবহাওয়া কিঞ্চিৎ সদয় হওয়ার আভাস পেয়ে বাবর আবার পর্বতে চড়তে শুরু করেন ৩০ এপ্রিল। ওই দিন তিনি সরাসরি উঠে যান ৬৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২ এ এবং পরদিন উঠেন ৭৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এ। বিকালটা সেখানেই অপেক্ষা করে মাঝরাতে তিনি বেরিয়ে পরেন শিখরের উদ্দেশ্যে।
একটানা ১১০০ মিটারের অধিক ভয়ানক চড়াই অতিক্রম করে তিনি ভোরে পৌঁছে যান শিখরে। আজ তিনি ক্যাম্প-২ ও আগামীকাল আগামীকাল (৩ মে) বেসক্যাম্পে নেমে আসবেন বলে প্রত্যাশা করেছেন অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান।
২০১৪ সাল থেকে পর্বতারোহণে বাবরের পথচলা শুরু। ট্রেকিং-এর জগতে তার হাতেখড়ি হয় ২০১০ সালে; পার্বত্য চট্টগ্রামের নানান পাহাড়ে পথচলার মধ্য দিয়ে।
চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তিনি। এই ক্লাবের হয়েই গত ১২ বছর হিমালয়ের নানান শিখরে অভিযান করে আসছেন তিনি।
মাকালু অভিযানে বাবর আলী। ছবি : ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স
ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন ২০১৭ সালে। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্যতম দুর্গম ও টেকনিক্যাল চূড়া আমা দাবলাম (২২,৩৪৯ ফুট) আরোহণ করেন বাবর।
২০২৪ সালে, একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন।
একই অভিযানে আর কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর দুটি আট হাজার মিটার পর্বত আরোহণের কৃতিত্ব নেই।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি আরোহণ করেন বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু।
প্রসঙ্গত, এটি প্রথম কোনো বাংলাদেশির কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই কোনো আট হাজার মিটার উচ্চতার শিখর আরোহণ। মাউন্ট মাকালু চৌদ্দটি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত শিখর স্পর্শের স্বপ্নের পথে বাবরের পঞ্চম সাফল্য।