মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ২ মাসে কে হারল, কে জিতল

তৌহিদুজ্জামান সোহান

আন্তর্জাতিক

দ্রুত ও নিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। সংঘাত শুরুর মাত্র ১০ দিনের মাথায় তিনি দম্ভ

2026-05-03T02:33:13+00:00
2026-05-03T02:33:13+00:00
 
  বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬,
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ২ মাসে কে হারল, কে জিতল
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ২:৩৩ এএম 
উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের রাস্তায় হরমুজ প্রণালীর চিত্র সম্বলিত ব্যানার। ছবি : আনাদোলু
দ্রুত ও নিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। সংঘাত শুরুর মাত্র ১০ দিনের মাথায় তিনি দম্ভ করে বলেছিলেন, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিক দিয়েই যুদ্ধ জিতে গেছে। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধ এখন থমথমে অবস্থায়। দেখা যাচ্ছে না চূড়ান্ত সমাপ্তির কোনো লক্ষণ। ওয়াশিংটন এখনও স্পষ্ট কৌশলগত সাফল্যের কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। শুরুতে সীমিত সময়ের সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত এই সংকট এখন সমগ্র বিশ্বকে এক বিশাল পঙ্কিল জলাভূমিতে ঠেলে দিচ্ছে।

রক্তক্ষয়ী এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত না যুক্তরাষ্ট্র জিতেছে, না ইরান। বরং তাদের সংঘাতের সুযোগে পিঁপড়া হয়ে লাভের গুড় নিয়ে যাচ্ছে তৃতীয় পক্ষ। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মেলানি সিসন সিএনএনকে বলেন, এই যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী কেউ-ই নয়। তবে কিছু দেশ এর প্রভাব মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মূল শক্তিগুলো এখন কোথায় দাঁড়িয়ে।

ইরানের সাধারণ মানুষ : বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধেই সাধারণ মানুষেরই সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং তাদের অবস্থা আরও করুণ। ইরানের সাধারণ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে উভয় দিক থেকে আগুনের মুখে পতিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। যার মধ্যে বেসামরিক অবকাঠামোও ছিল।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরানের মতে, এসব হামলায় ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যার মধ্যে ১ হাজার ৭০০ জনই বেসামরিক নাগরিক। ট্রাম্প তো ইরানের শাসকদের হুঁশিয়ার করে বলেছেন, যদি তেহরান তার দাবির কাছে মাথা না নত করে, তা হলে তিনি ইরানের ‘পুরো সভ্যতাই’ ধ্বংস করে দেবেন।

ঠিক একই সময়ে ইরানি শাসকগোষ্ঠী ভেতরে সব ধরনের বিরোধিতার বিরুদ্ধে তাদের নৃশংস দমনপীড়ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির নেতৃত্বে শাসকগোষ্ঠী আগের চেয়েও বেশি কঠোর হয়ে উঠেছে। তাদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখালে তার পরিণতি কী হয় সে বার্তাই স্পষ্ট করতে চায় তেহরানের নেতারা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির বিক্ষোভে বহু মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত সরকার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আর ইরানের সাধারণ মানুষ আট সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরকারি ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইরানের অর্থনীতিও প্রবল আঘাত পেয়েছে, যার ফলে চাকরি হারাচ্ছে মানুষ, বাড়ছে দারিদ্র্য।

লেবাননের সাধারণ মানুষ : ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যকার সংঘাতে বহু বছর ধরে জড়িয়ে পড়েছে লেবাননের মানুষ। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। কিন্তু ইসরাইল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার পর হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। জবাবে ইসরাইল হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে প্রাণঘাতী বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

স্যাটেলাইট ছবির সিএনএন বিশ্লেষণ বলছে, ইসরাইল লেবাননে ঠিক গাজার মতোই কৌশল অনুসরণ করছে। পুরো গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসরাইল জানিয়েছে, যতদিন হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে, ততদিন দক্ষিণ লেবাননের ৬ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে না।

উপসাগরীয় দেশগুলো : বর্তমানে উপসাগরের দেশগুলো এমন এক যুদ্ধের গভীর প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে, যা তারা চায়নি। এমনকি যুদ্ধ ঠেকাতে তারা প্রচণ্ড চেষ্টাও করেছিল। অনেক ধ্বংসাত্মক সংঘাতের খুব পাশাপাশি অবস্থান করেও দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চল স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি উপভোগ করছিল। কিন্তু ইরান যখন আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে তাদের ওপর হামলা শুরু করে, তখন সেই সুখ ঘুচে যায়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইসরাইলসহ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি হয়েছে এই দেশটিতে। যদিও এসব হামলার অধিকাংশই প্রতিহত করা হয়েছে, তবু ক্ষতি হয়ে গেছে। আমিরাতের আঞ্চলিক ব্যবসা ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে যে খ্যাতি, তা হুমকির মুখে পড়েছে। 

এদিকে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ইরাক, কাতার ও কুয়েতের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়েই তারা তাদের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ইরাক, কাতার ও কুয়েতের অর্থনীতি এ বছর সংকুচিত হবে।

আমেরিকার সাধারণ মানুষ : এই যুদ্ধ আমেরিকান জনগণ ও তাদের মানিব্যাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তারা ইতিমধ্যেই পেট্রোল, বিমানের টিকেট, এমনকি অনেক সেবার জন্যও বেশি টাকা দিচ্ছে। অনেক ব্যবসা এখন পণ্যমূল্যে জ্বালানি সারচার্জ যোগ করছে। মার্চ মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। সাধারণ মার্কিনিরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের মেলানি সিসন বলেন, এখন আর নরম সুরে বলার উপায় নেই। আমেরিকার বর্তমান অবস্থা ভালো নয়। মানুষের ও পণ্যের চলাচলের জন্য আমেরিকার অর্থনীতি জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ কম। 

ট্রাম্প একটি বিশাল জুয়া খেলেছেন। সেটি এখনও সফল হয়নি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের। যার লক্ষ্য হবে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির অবসান। এমনকি ইরানি শাসনকেও উৎখাত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্যগুলো এখনও অর্জিত হয়নি। এমনকি সংঘাতের অবসান নিয়েও ধোঁয়াশায় মার্কিনিরা।

আমেরিকার ভেতরে যুদ্ধটি শুরু থেকেই জনপ্রিয় ছিল না। যত দিন যাচ্ছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ততই কমছে। সিএনএনের পোল অব পোলস (সাম্প্রতিক জরিপগুলোর গড়) অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত তিন সপ্তাহে প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন মাত্র ৩৭ শতাংশ। সিসন যোগ করেন, জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই খারাপ এবং আরও খারাপ হচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে সহায়ক নয়। কূটনৈতিকভাবেও ট্রাম্পকে এখন দুর্বল দেখাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে তিনি বুঝতে পেরেছেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করলে আমেরিকার প্রচুর খরচ হবে। 

অন্যদিকে পারমাণবিক ইস্যু, হরমুজ প্রণালি, শাসকগোষ্ঠী বদলের ব্যাপারে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ট্রাম্প এখনও বিজয়ী হতে পারেন। যদি ইরান বাধ্য হয়ে আমেরিকার সর্বোচ্চ দাবির কাছে মাথা নত করে। কিন্তু মনে হচ্ছে তা ঘটার সম্ভাবনা কম, অন্তত স্বল্পমেয়াদে তো নয়ই।

বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তারা : বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের প্রভাবে পড়তে শুরু করেছে। এশিয়ার পরিস্থিতি খুবই করুণ। কারণ মহাদেশটির অনেক দেশ উৎপাদনের জন্য তেল ও অন্যান্য পেট্রো রাসায়নিকের ওপর আমদানিনির্ভর। লাতিন আমেরিকার মানুষ জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্যের সঙ্গে লড়াই করছে। এই সংকট আফ্রিকার সংগ্রাম ক্লান্ত অর্থনীতিগুলোর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। আর ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘এক বড় ধাক্কা’র শঙ্কায় সতর্কবার্তা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে এ বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪.১ শতাংশ থেকে কমে ৩.৮ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। এখন তারা ধারণা করছে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে ৪.৪ শতাংশ।
আইএমএফ আরও জানিয়েছে, তারা এ বছরের জন্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। 

জানুয়ারিতে যেখানে ৩.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.১ শতাংশে। সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর আঘাত পড়বে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে সারের মূল্য আকাশছোঁয়া হওয়ায়। কারণ ভুক্তভোগী দেশগুলো কৃষির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং তারা তাদের মোট আয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে খরচ করে।

ইসরাইল ও নেতানিয়াহু : মাত্র কয়েক বছর আগেও ইরান ও ইসরাইলের সরাসরি সংঘর্ষের ধারণা ছিল অকল্পনীয়। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো আমেরিকা-ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ। এটি প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি কৌশলগত জয় ছিল, অন্তত প্রথম দিকে। গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু আবারও তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেবেন’ এবং তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘পূর্ণ সহযোগিতায় কাজ করছেন।’

এই সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক শক্তির অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনা নেতানিয়াহুকে খানিকটা সুবিধাই দিয়েছে। কারণ ইসরাইলে এ বছর নির্বাচনি বছর। তা ছাড়া অনেক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইহুদি ইসরাইল-ইরান সঙ্গে যুদ্ধ সমর্থন করলেও তারা মনে করে না যে আমেরিকা ও ইসরাইল যুদ্ধে জিতছে। এই যুদ্ধ আগে থেকেই গাজার ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কারণে নষ্ট হওয়া আমেরিকার ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া উত্তর ইসরাইলের বিপুলসংখ্যক মানুষও হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ অঞ্চলটিতে হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হুমকি ক্রমবর্ধমান।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী : ইরানের শাসকগোষ্ঠীও এই সংঘাতে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। বহু বছর ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অসংখ্য শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এখনও টিকে আছে। আর তাদের নতুন নেতারা আগের চেয়ে বেশি কট্টরপন্থি বলে মনে হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা দেখিয়েছে যে তারা কীভাবে সমগ্র বিশ্বকে জিম্মি করতে পালে। ফলে কূটনৈতিক পরিধিতে তারা নতুন এক সুযোগ পেয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, হরমুজ নিয়ে ইরান পাশা খেলছে। আর সেই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের ফলস্বরূপ তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে ‘প্রণালিটির ওপর কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে’। এর ফলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

ইউক্রেন : ইরান যুদ্ধ কিয়েভের জন্য খুবই খারাপ সংবাদ। গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ অন্য খাতে সরে গেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহে সিএনএনকে জানান, ব্যালিস্টিক-বিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে গেছে। কারণ আমেরিকায় উৎপাদনক্ষমতা সীমিত।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বিশ্বের দৃষ্টি ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নিয়েছে। আমেরিকার আলোচনাকারী দল, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, তিনি এখন মনোযোগ দিচ্ছেন ইরানের দিকে। তবে আশার আলোও আছে। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে ইউক্রেন ড্রোন উৎপাদনে এক সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়েছে। ইরানি হুমকি বিশ্বকে এই বিষয়টি লক্ষ্য করতে বাধ্য করেছে।

ইয়াকুবিয়ান বলেন, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেনের জন্য কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করেছে। জেলেনস্কি উপসাগরীয় অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। তারা তাকে বাহু খুলে স্বাগত জানিয়েছে... এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হতে পারে। কারণ ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি উন্নয়নে তাদের সম্মিলিত আগ্রহ রয়েছে। 

আপাতত বিজয়ী বা লাভবান যারা
চীন : বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিং এই সংঘাত থেকে আরও শক্তিশালী অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারে। চীন তেল সংকট তুলনামূলক ভালোভাবে সামলেছে। গত এক দশক ধরে তারা তেলের বিশাল মজুদ তৈরি করেছে, আমদানির উৎস ভিন্ন ভিন্ন করেছে এবং কয়লা ও নবায়নযোগ্য শক্তিসহ দেশীয় জ্বালানি উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুতের দিকে রূপান্তর দ্রুততর করেছে। এতে উচ্চ তেলের দামের চাপ মোকাবিলায় চীন সক্ষম হচ্ছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে চীনের সোলার প্যানেল ও বায়ুচালিত টারবাইনের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। 

তারপর আছে কূটনৈতিক দিক। ইয়াকুবিয়ান বলেন, এই যুদ্ধ আমেরিকার সুনামের যে ক্ষতি করেছে, তাতে চীন উপকৃত হতে পারে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ভাবমূর্তি বিপুল আঘাত পেয়েছে। এটি একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ। শুধু আমেরিকাতেই নয়, সারা বিশ্বে। আর চীন সুযোগ বুঝে নিচের জায়গাটি দখল করতে পেরেছে। তারা নিজেদের বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের মূল রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

আরও রয়েছে নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আমেরিকাকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ এশিয়া থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। এর ফলে সেই অঞ্চলে আমেরিকার প্রতিরোধ ভঙ্গুর হয়েছে। যেখানে চীন দিন দিন নিজের শক্তি বাড়াচ্ছে এবং তাইওয়ান নিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষা বজায় রেখেছে। তবে চীনের অর্থনীতি রফতানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। বৈশ্বিক অর্থনীতি যদি ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে, তা হলে চীনা পণ্যের ক্রেতা কমে যাবে। এটি ইতিমধ্যেই ঘটছে। চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি কমে যাচ্ছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেল কোম্পানি : সারা বিশ্বের মানুষের জন্য তেলের দাম আকাশছোঁয়া হলেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানিগুলো লুফে নিচ্ছে মোটা মুনাফা। শেভরন, শেল, বিপি, কনোকোফিলিপস, এক্সন ও টোটাল-এনার্জিজ- সব কোম্পানিই উচ্চ তেলের দাম এবং দামের ওঠানামার কারণে অতিরিক্ত মুনাফা কামাচ্ছে। অক্সফামের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয়টি কোম্পানি এ বছর ৯৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করতে পারে। তবে এই উচ্চ মুনাফার ফলে অনেক দেশে এই কোম্পানিগুলোর ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ (অতিরিক্ত মুনাফার কর) আরোপের ডাক পড়েছে। এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানির পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

রাশিয়া : নিঃসন্দেহে, রুশ অর্থনীতি এই সংঘাতে উৎসাহ পাচ্ছে। উচ্চ তেল ও সারের দাম ক্রেমলিনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ এনে দিয়েছে। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়তে থাকায় আমেরিকা সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, যাতে তেলের বাজারে নতুন সরবরাহ আসে। 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এ সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছে, রাশিয়ার জ্বালানি আয় ফেব্রুয়ারির ৯.৭৫ বিলিয়ন ডলার থেকে মার্চে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে ইউক্রেন রুশ তেল স্থাপনাগুলোতে (বিশেষ করে বন্দর ও শোধনাগারে) হামলা চালিয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার তেল বিক্রিতে বাধা পড়ছে।

ইয়াকুবিয়ান বলেন, তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কিন্তু’ আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেন যে নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে তা রুশদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। কারণ তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মধ্যপ্রাচ্যে ঢুকে পড়ছে। অথচ এই অঞ্চলে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও সম্পর্ক রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি : বৈশ্বিক তেল সংকট অনেক দেশে ক্লিন এনার্জি (পরিষ্কার জ্বালানি) রূপান্তরের আকাক্সক্ষাকে আরও গভীর করেছে। যা এই খাতের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। ইউরোপীয় কমিশন গত সপ্তাহে এক নতুন কৌশল ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের জবাব হিসেবে জনগণকে ‘জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য ধাক্কা’ থেকে রক্ষা করতে ‘ঘরে তৈরি পরিষ্কার জ্বালানি’ সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করার প্রয়াস নিয়েছে। তবে ইরান সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহৃত উপকরণের (যেমন অ্যালুমিনিয়াম) দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।

ড্রোন উৎপাদক ও অস্ত্র নির্মাতা : যেকোনো সংঘাতের মতোই এ সংকটেও অস্ত্র নির্মাতারাও লুফে নিচ্ছে মুনাফা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২.৯ শতাংশ বেড়ে ২.০১৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। 

ইনস্টিটিউটের সামরিক ব্যয় ও অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচির গবেষক জিয়াও লিয়াং বলেন, এই বৃদ্ধির কারণ হলো রাষ্ট্রগুলো বৃহদায়তনে অস্ত্রাভিযানের মাধ্যমে আরও এক বছরের যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জবাব দিচ্ছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংকটের পরিধি এবং অনেক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্য বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভবত ২০২৬ ও তার পরেও অব্যাহত থাকবে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা খাতও বিজয়ীর বেশে থাকবে বলে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলার পর গত কয়েক মাসে বিশ্বের কিছু বড় প্রতিরক্ষা কোম্পানির শেয়ারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর আংশিক কারণ আমেরিকায় ইরান যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যতে নীতি পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা। আরও অনিশ্চয়তা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেস অনুমোদন করবে কি না, তা নিয়ে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মার্কিন  ইরান  যুদ্ধ  হারল  জিতল 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: