যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধের মধ্যেই বিরল এক অভিযানে রান্নার গ্যাস বা এলপিজি বহনকারী ভারত সংশ্লিষ্ট একটি বিশাল ট্যাঙ্কার সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
শনিবার (২ মে) ৪৫ হাজার টন এলপিজি নিয়ে ‘সর্ব শক্তি’ নামক জাহাজটি ইরানের লারাক ও কেশম দ্বীপ অতিক্রম করে ওমান উপসাগরের দিকে অগ্রসর হয় বলে জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যে জানা গেছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে ইরান সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট মেটাতে এই জাহাজটির সফল পারাপারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী এই বিশাল গ্যাস ক্যারিয়ারটি মূলত পারস্য উপসাগর ও ভারতীয় বন্দরগুলোর মধ্যে যাতায়াত করে থাকে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তার খাতিরে অনেক জাহাজ যে কৌশল অবলম্বন করছে, তার অংশ হিসেবে ‘সর্ব শক্তি’ জাহাজটিও ভারত অভিমুখে যাত্রার সংকেত দেওয়ার পাশাপাশি সেখানে ভারতীয় ক্রু থাকার বিষয়টি প্রচার করছে।
ব্লুমবার্গের দেখা একটি শিপিং নথি অনুযায়ী, এই চালানের আমদানিকারক হিসেবে নাম রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের (আইওসি)। গত মাসে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য খুলে আবার দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এটিই এ পথে বের হওয়া অন্যতম বৃহত্তম কার্গো জাহাজ।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক এবং এলপিজির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে ভারত বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকদের কাছ থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিতে রান্নার গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই নয়াদিল্লি এলপিজি বাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি ভারতের নিজস্ব বন্দরগুলোতে এলপিজি ট্যাঙ্কার খালাসের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতিদিন ৫৪ হাজার টনে উন্নীত করেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ গত এপ্রিলের এক সাপ্তাহিক ছুটিতে ইরান পথটি পুনরায় চালুর ঘোষণা দিলেও পরে জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর ফলে অনেক জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তবে ভারতের তেলমন্ত্রী হারদীপ পুরি গত শুক্রবার জানিয়েছেন, তেহরানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ভারত এখন পর্যন্ত আটটি এলপিজি জাহাজ এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও পার করতে সক্ষম হয়েছে।
‘সর্ব শক্তি’ জাহাজটি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল এবং দুবাইয়ের অদূরে অন্য একটি জাহাজ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেছিল। যদিও এই গ্যাসের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাধারণত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অতিক্রম করতে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এই অঞ্চলে বর্তমানে তীব্র ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের কারণে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং অনেক জাহাজ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে নিজেদের ট্রান্সপন্ডার সিগন্যাল বন্ধ রাখছে। দুবাইভিত্তিক ফোরসাইট গ্রুপ সার্ভিসেস লিমিটেড এই জাহাজটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
সংকটের এই সময়ে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের দুঃসাহসিক সামুদ্রিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে মার্কিন অবরোধ এবং সামরিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি