কেন কারাবন্দিরা ধর্মের পথে ঝোঁকে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফিচার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর গুলশানের হত্যাচেষ্টা মামলায় নাম জড়ায় অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিকের। গত বছরের ২৯ এপ্রিল মারধরের পর তাঁকে

2026-05-03T16:20:39+00:00
2026-05-03T20:02:26+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
কেন কারাবন্দিরা ধর্মের পথে ঝোঁকে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ৪:২০ পিএম  আপডেট: ০৩.০৫.২০২৬ ৮:০২ পিএম
এআই জেনারেটেড ছবি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর গুলশানের হত্যাচেষ্টা মামলায় নাম জড়ায় অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিকের। গত বছরের ২৯ এপ্রিল মারধরের পর তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করেছিল উত্তেজিত জনতা। ১১ মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সিদ্দিক। কিন্তু আর দর্শকদের পরিচিত সিদ্দিক নেই। কারাবাসকালে ধর্ম চর্চা মনোযোগী হয়ে আমূলে বদলে ফেলেছেন নিজেকে।


এ ঘটনা শুধু অভিনেতা সিদ্দিকের বেলায় ঘটেছে, এমন নয়। সারা বিশ্বে কারাগারে থাকা মানুষের একটা বড় অংশের মাঝে নিজ নিজ ধর্মের প্রতি বিশেষ ঝোঁক তৈরি হতে দেখা গেছে। কিন্তু এ প্রবণতা কেনো দেখা দেয়, কিংবা এর পেছনে কারাবাসীদের কী ধরনের সাইকোলজি কাজ করে!


বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারের কঠোর এবং বিচ্ছিন্ন পরিবেশে ধর্ম মানুষের জন্য কেবল একটি বিশ্বাস নয়, বরং মানসিকভাবে টিকে থাকার একটি প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।


গবেষক হ্যারি আর. ড্যামারের মতে, বন্দিরা সাধারণত ‘জীবনের নতুন অর্থ ও দিকনির্দেশনা’ খুঁজতে ধর্মীয় কার্যকলাপে যুক্ত হন। বন্দিরা তাদের জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেন। ধর্ম তাদের পুনরায় লক্ষ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এবং কারাগারে অপরাধী পরিচয় মুছে ফেলে একজন ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়া যায়।


‘ফাইনডিং দেয়ার ফেইথ : হোয়াই ডো প্রিজনার্স চুজ ইসলাম?’ এ উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ করে ইসলামের ক্ষেত্রে নিয়মিত নামাজ বা রোজা রাখার মতো দৃশ্যমান আচারগুলো বন্দিদের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসে, যা তাদের আকৃষ্ট করে।


মনোবিজ্ঞানী রবার্ট অ্যাগনিউয়ের মতে, কারাবাস একটি তীব্র মানসিক চাপ বা 'স্ট্রেন' সৃষ্টি করে কারণ এখানে মানুষ তার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং স্বায়ত্তশাসন হারায়। এই চাপ থেকে রাগ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। ধর্ম এই নেতিবাচক আবেগ মোকাবিলা করার একটি 'প্রোসোশ্যাল কোপিং' (ইতিবাচক মানিয়ে নেওয়া) কৌশল হিসেবে কাজ করে।


আবারও ফিরি অভিনেতা সিদ্দিকের বক্তব্যে। তিনি বলছেন ‘এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা’ নিয়ে ফিরেছি। জীবনের নতুন অর্থ ধরা দিয়েছে তার কাছে।


সিদ্দিক বলেন, ‘আমি প্রায় ১০ মাস ২২ দিন কারাগারে ছিলাম। জীবনের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছি। ভাবছিলাম আমি শিল্পী মানুষ। সময়টাকে কাজে লাগাই। আল্লাহ আমাকে পরিবর্তন করিয়েছেন। আগে দ্বীনের কাজে সেভাবে লিপ্ত ছিলাম না। জেলে নিয়মিত কোরআন পড়েছি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করলাম। সেখান থেকে ধীরে ধীরে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসে।’


আমরা মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কলের কাছে এমন মত পাচ্ছি, তিনি বলছেন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জীবনের একটি ‘অর্থ’ প্রয়োজন। কারাগারে বন্দিরা যখন ‘একজিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস’ বা অস্তিত্বের সংকটে ভোগেন, তখন ধর্ম তাদের ‘একজিস্টেনশিয়াল কোহেরেন্স’ বা জীবনের একটি যৌক্তিক কাঠামো দেয়।’


কারাবাসীদের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোপিং মেকানিজমও বিশেষভাবে কাজ করে। ডেভিড লিঞ্চের গবেষণা অনুযায়ী, ধর্মীয়ভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি দুই ধরনের হতে পারে :


ইতিবাচক ধর্মীয় কোপিং : এটি স্রষ্টার সঙ্গে একটি নিরাপদ সম্পর্ক এবং আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় এবং বিষণ্ণতা কমাতে অত্যন্ত কার্যকর।


নেতিবাচক ধর্মীয় কোপিং : যদি কোনো বন্দি মনে করেন স্রষ্টা তাকে শাস্তি দিচ্ছেন বা তাকে ত্যাগ করেছেন, তবে তা তার মানসিক যাতনা এবং বিষণ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এ বিষণ্ণতা থেকেও ধর্ম চর্চার প্রবণতা তৈরি হয়।


অভিনেতা সিদ্দিকের কথায় ফিরি। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, কারাগারের সময়টা শুধু শাস্তির ছিল না, বরং আত্মসমালোচনা ও ভেতরের পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


তার এ ‘পরিবর্তন’কে গবেষকরা বলছেন ‘হিউম্যান এজেন্সি’। এক অন্য মানুষে নিজেকে গড়ে তোলা। আমরা সিদ্দিকের দিকে তাকালে তার অন্তর্গত পরিবর্তনের পাশাপাশি বাহ্যিক পরিবর্তন দেখতে পাই। এবং এ অন্য মানুষ হয়ে উঠা তাড়া থেকেও কারাবন্দিরা ধর্মের বিষয়ে অনুরাগী হয়ে উঠেন। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারে ধর্ম গ্রহণ করাকে অনেক সময় ‘নতুন পরিচয় নির্মাণ’ হিসেবে দেখা হয়। কয়েদিরা তাদের অতীত অপরাধী জীবনকে নতুন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে তা থেকে মুক্তি পেতে চায়।


গবেষক মারুনা বলছেন, এই প্রক্রিয়াটি বন্দিদের মধ্যে ‘হিউম্যান এজেন্সি’ বা নিজের জীবন পরিবর্তনের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা জাগ্রত করে, যা তাদের পুনর্বাসনে সাহায্য করে।


দক্ষিণ আফ্রিকার একটি স্টাডি থেকে এ প্রবণতার বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ৪২৫ জন বন্দির ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় বন্দিরা তাদের রাগ, হতাশা এবং উদ্বেগ অনেক ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ধর্মীয় সম্পৃক্ততা বন্দিদের মধ্যে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমা এবং কৃতজ্ঞতার মতো মানবিক গুণাবলি বৃদ্ধি করে।


গবেষণায় দেখা গেছে যে, ব্যক্তিগত ধর্মীয় চর্চা যেমন— নিভৃতে প্রার্থনা বা পবিত্র গ্রন্থ পাঠ, সম্মিলিত প্রার্থনার চেয়েও বেশি মানসিক প্রশান্তি দেয়। এবং কারাগারে সে সুযোগ প্রবল থাকে।


গবেষকরা বলছেন, কারাগারে ধর্ম কেবল আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী মানসিক অবস্থা যা বন্দিদের মানবিকতা টিকিয়ে রাখতে এবং অপরাধমুক্ত জীবনের দিকে ফিরে যেতে সাহায্য করে। এটি বন্দিদের একটি মরাল কমিউনিটি বা নৈতিক সমাজের অংশ করে তোলে, যা তাদের পুনর্বাসনের পথ সুগম করে।


/ইউএমএইচ



Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: