সংবাদপত্র হলো জনমত গঠনের, মানুষের কথা তুলে ধরার এবং দেশ বিদেশের নানান খবরাখবর মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম। সংবাদপত্র ছাড়া আজকের এই আধুনিক সমাজ কল্পনাই করা যায় না। শুধু আধুনিক সমাজেই নয়, সংবাদপত্র তার যাত্রা শুরু করেছে আরও অনেক আগে। আজ সংবাদপত্র স্বাধীনতা দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। সংবাদপত্রের শুরু থেকে বর্তমান অবস্থাসহ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে লিখেছেন বন্যা নাসরিন
শুরুর গল্প
১৭৮০ সাল। কলকাতা থেকে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে বাংলাদেশে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। শুধু বাংলাদেশই নয়, বরং গোটা ভারতীয় উপমহাদেশেই এটি ছিল প্রথম সংবাদপত্র। কিন্তু, পত্রিকাটি ছিল ইংরেজি ভাষার। কারণ, এর সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি, যিনি অবাঙালি এবং বিদেশিও।
বাংলা সংবাদপত্র
তারপর কেটে যায় ৩৬টি বছর। বাঙালি সম্পাদক ও প্রকাশক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার পত্রিকা ‘বাঙ্গাল গেজেট’। অবশ্য, সংবাদপত্রটি প্রকাশের তারিখ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ‘ওরিয়েন্টাল স্টার’ সূত্র মতে ১৮১৮ সালের ১৬ মে এবং ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায়ের মতে, ১৪ই মে থেকে ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে বাঙ্গাল গেজেট প্রকাশ হয়েছিল। কোথাও আবার ১৮১৬ সালেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
সম্পাদক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সহকারী ছিলেন হরচন্দ্র রায় এবং পত্রিকাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও উৎসাহদাতা ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। সংবাদপত্রটি এক বছর প্রকাশ হয়েছিল বলে জানা যায়। পত্রিকাটির কোনও অনুলিপি সংরক্ষিত নেই।
এরপর দিগদর্শন, সমাচার দর্পণ এসব বাংলা পত্রিকাও যাত্রা শুরু করে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের উদ্যোগে শ্রীরামপুর থেকে বাংলা মাসিক পত্রিকা দিগদর্শন প্রকাশিত হয়।
অন্যদিকে, জন ক্লার্ক মার্শম্যান ছিলেন সমাচার দর্পণের নামমাত্র সম্পাদক। মূলত বাঙালি পণ্ডিতরাই সমাচারদর্পণ সম্পাদনা করতেন। এই সংবাদপত্রটি শুরুতে সপ্তাহে একবার, এরপর সপ্তাহে দুইবার করে প্রকাশিত হতো। ১৮৪১ সাল পর্যন্ত এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে কয়েকবার এর পুনঃপ্রকাশ হয়েছিলো।
দিগদর্শন, সমাচার দর্পণের পরেও কিছু উল্লেখযোগ্য বাংলা সংবাদপত্র আসে। যেমন, সংবাদ প্রভাকর, বাংলার সংবাদ, অমৃতবাজার পত্রিকা ইত্যাদি। ব্রিটিশ শাসনকালীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, নারী শিক্ষার প্রসার, সংস্কৃতির উন্নয়নসহ সামাজিক পরিবর্তনে এসব পত্রিকাগুলো ব্যপক ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা বা পূর্ববাংলার সংবাদপত্র
ঢাকায় বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু হয় তারও অনেক পরে। এমনকি ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা ছিলো ইংরেজি ভাষার। আলেকজান্ডার ফর্বেসের সম্পাদনায় ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল, মতান্তরে ২৬শে এপ্রিল ‘দ্য ঢাকা নিউজ’ নামে সেই ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়াও তিনিই এই পত্রিকাটির প্রকাশক বা মুদ্রাকর ছিলেন।
১৮৫৯ সালে ঢাকায় বাংলাযন্ত্র নামে প্রথম বাংলা মুদ্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই ৭ মার্চ, ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘ঢাকা প্রকাশ’, যা ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি অন্যতম প্রকাশনা। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন ঢাকার নর্মাল স্কুলের বিশিষ্ট পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী ও কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। তৎকালীন দেশীয় রাজনৈতিক সংবাদ, আলোচনা, সাহিত্য-সংস্কৃতির খবর, কুসংস্কার নিরসন, ভাষা ব্যবহার বিতর্ক, পরীক্ষায় নকল, খাজা-নবাবদের দান-প্রতিদান নিয়ে নানা মন্তব্য থেকে শুরু করে ইংরেজ-নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনির খবর লাগাতার পরিবেশন করতো পত্রিকাটি।
তৎকালীন পূর্ববাংলায় গ্রাম ও তৃণমূল পর্যায়েও সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ দেখা যায়। তার ভেতর অন্যতম ছিলো মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে প্রকাশিত পারিল বার্ত্তাবহ পত্রিকা।
সংবাদপত্রের ইতিহাসে যাদের অবদান অবিস্মরণীয়
বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য, কাঙাল হরিনাথ, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সুরেশ চন্দ্র মজুমদার প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদানও অনেক।
কাঙাল হরিনাথ তথা হরিনাথ মজুমদার ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং বাউল গানের রচয়িতা। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায় জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক প্রথমে ’সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লিখতেন। পরে তিনি নিজেই ১৮৬৩ সালে ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। কালক্রমে এটি প্রথমে পাক্ষিক ও পরে সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এতে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজসচেতনতামূলক নানান বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত ছাপা হত।
তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের উন্নতির জন্য এবং তাদের শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে সারাজীবন আন্দোলন করেছেন। তার প্রকাশিত পত্রিকাটিও অধিকার বঞ্চিত মানুষ, প্রজা বা শ্রমজীবী মানুষের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলো। এ কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকার এবং স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে হুমকিও পেতেন। তবুও তিনি তার ন্যায়ের পক্ষে, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে থাকার লড়াইটা কখনো থামাননি।
সংবাদপত্রের বর্তমান অবস্থা
সময়ের সাথেসাথে সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে বসবাস করার দরুণ পরিবর্তন একটু দ্রুতই ঘটে। বর্তমানে মানুষ শুধু প্রিন্ট পত্রিকাই পড়ে না, বরং রূপান্তরিত হওয়া ডিজিটাল ভার্সনের পাঠক অনেক বেশি। দ্রুত সংবাদ পরিবেশনে ডিজিটাল ভার্সনের বিকল্প নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রিন্ট ও ডিজিটাল দুইভাবেই সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র ডিজিটাল ভার্সন বা অনলাইন পোর্টাল পরিচালনা করে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেন জরুরি
সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের দর্পণ। যে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে না, সেই দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও থাকে না। আর মত প্রকাশ করতে না পারলে প্রতিটা নাগরিকই মূলত পরাধীন থেকে যায়। সংবাদপত্র মানুষের অধিকারের কথা বলবে, অনিয়ম, দুর্নীতি, শোষণ, বঞ্চনার কথা তুলে ধরবে, প্রতিবাদ জানাবে। তবেই না সমাজের মানুষের সমস্যার সমাধান হবে, দুর্নীতি কমবে, জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হবে. মানুষ সত্যিটা জানতে পারবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্রও থাকে না।
এক্ষেত্রে সাংবাদিক বা সংবাদপত্রে কর্মরত মানুষদেরও দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রের যেমন উচিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করা, তেমনই সাংবাদিকদেরও সৎ থাকতে, সত্য প্রকাশে নির্ভীক থাকতে হবে। সাংবাদিকরা কোনও দলের না হয়ে, গণমানুষের হবে, মানুষের অধিকারের কথা বলবে, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। তবেই সুস্থ সাংবাদিকতা আর সুন্দর রাষ্ট্রব্যাবস্থা বজায় থাকবে।
/মহু