এক মণ ধানেও মেলে না শ্রমিক

এইচএম. ফারুক, তানোর (রাজশাহী)

সারাদেশ

চিকন ধান (জিরাশাইল) উৎপাদনে দেশজুড়ে রাজশাহীর ব্যাপক সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে চিকন ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হয়।

2026-05-04T02:40:36+00:00
2026-05-04T02:40:36+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
এক মণ ধানেও মেলে না শ্রমিক
এইচএম. ফারুক, তানোর (রাজশাহী)
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ২:৪০ এএম 
রাজশাহীর তানোরে বোরোক্ষেত থেকে ধান কাটছেন এক কৃষক। ছবি : সময়ের আলো
চিকন ধান (জিরাশাইল) উৎপাদনে দেশজুড়ে রাজশাহীর ব্যাপক সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে চিকন ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হয়। এ বছর রাজশাহীর তানোরে চলতি বোরো মৌসুমের ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। শ্রমিক সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাজারে ধানের ন্যায্য মূল্য না থাকা এর কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। 

চাষিরা বলছেন, এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত উঠছে না তাদের। এতে বোরো চাষিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। বহিরাগত শ্রমিক না আসা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় ধান মাটিতে নুয়ে পড়ার কারণে শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে, ফলে মজুরিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

জানা গেছে, বাজারে এক মণ ধান চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ -১ হাজার ১৫০ টাকা দরে (৪১ কেজি)। অথচ বাজারে কমেনি চালের দাম। চাষিরা বলছেন, মিলার ও আড়তদাররা যোগসাজশ করে ধানের দাম নিয়ে সিন্ডিকেট করছে। তারা ভরা মৌসুমে কম দামে ধান সংগ্রহ করে মজুদ করে, যখন কৃষদের ঘরে ধান থাকে না তখন মজুদ করা ধানের চাল উচ্চ মূল্যে বাজারে সরবরাহ করে। 

অন্যদিকে আড়তদাররা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে মিলারদের মোকাম থেকে নিয়মিত গাড়ি না আসায় ধানের দাম কমছে বলে মনে করছেন তারা। ফলে হাট বা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ধান বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। তবে হাট থেকে সরাসরি সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করলে লাভবান হবেন তারা। তাদের মতে, এভাবে বিক্রি করলে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে।

চাষিরা জানান, চলতি মৌসুমে আলু চাষে ব্যাপক লোকসানের পর ধানেও ক্ষতির মুখে পড়ায় অনেক কৃষক চরম সংকটে পড়েছেন। উপজেলার বিলকুমারী বিলে আগাম বোরো ধান চাষ হয়। এ ছাড়া আলু উত্তোলনের পর মার্চ মাসের শুরু থেকে আরেক দফা বোরো চাষ শুরু হয়।

চান্দুড়িয়া ইউপির চান্দুড়িয়া ব্রিজ ঘাট থেকে তানোর পৌরসভা হয়ে কামারগাঁ ইউপির মালশিরা চৌবাড়িয়া ব্রিজ ঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বিলের জমিতে আগাম বোরো চাষ করা হয়। বর্তমানে এসব জমির ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিঘাপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ২৫ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। 

রাজিব নামের এক কৃষক জানান, তিনি সাড়ে ১৪ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিছু জমির ধান কেটে বাড়িতে আনা হয়েছে। শ্রমিক সংকটে বাকি ধান মাঠ থেকে ঘরে আনতে চিন্তায় তিনি। তিনি আরও বলেন, ঋণ করে চাষাবাদ করেছি, ধান ঘরে রাখতে পারব না। বিক্রি করতে হবে। তবে বাজারে যে দাম তাতে ঋণের টাকা উঠবে বলে মনে হয় না।  হালচাষ, সার, বীজ, কীটনাশক বাবদ খরচ প্রতি বছরের তুলনায় বেড়েছে। এ ছাড়া মাড়াইয়ের জন্য আগের তুলনায় বেশি ধান দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। আগে যেখানে ১৫ কেজি ধান দিতে হতো, এখন ২০ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

হাবিবুর রহমান নামের আরেক কৃষক জানান, ২৪ কাঠা জমির ধান কাটা হয়েছে। ৮ জন শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হয়েছে, যেখানে জনপ্রতি একবেলা ৭০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে, আর সকাল ৭টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ১ হাজার-১ হাজার ৩০০ টাকা। তিনি বলেন, এখন শ্রমিক সংকট এবং অতিরিক্ত মজুরির কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, বহিরাগত শ্রমিক না আসায় ধান কাটতে দেরি হচ্ছে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা চুক্তিভিত্তিক কাজ না করে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন। ফলে ধান কাটা খরচ আরও বেড়ে গেছে।

সরকারি খাদ্য গুদামে সরকার ধান ক্রয় করলেও প্রশাসনিক জটিলতা, লেবার খরচ, পরিবহন খরচ ও দালালদের দৌরাত্মের কারণে অনেক কৃষকই ধান নিয়ে সরকারি খাদ্য গুদামে যায় না। তবে কৃষকরা ধান নিয়ে না গেলেও প্রভাবশালী চক্র বরাদ্দের ধান পূর্ণ করে দেয়। যার কারণে কৃষকরা কোনো সুবিধা বা উপকার পায় না। তাই সরাসরি হাট থেকে চাষিদের সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের দাবি জানান তারা।

মনোরঞ্জন দাস মুনা জানান, তিনি ১৭ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। লিজমানিসহ বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘাতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে। 

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক কৃষকই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। ধানের দাম কম কিন্তু চালের দাম বেশি। এ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন। তারা সরকারি হাটে সরাসরি ধান ক্রয় বা নির্ধারিত দামে সংগ্রহ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো বিলের ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 


  বিষয়:   এক মণ ধান  শ্রমিক  ধান  ন্যায্য দাম  চাষি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: