বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো হাড়ের শক্তিও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অনেকেই মনে করেন, বয়স হলে ব্যথা বা দুর্বলতা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাস্তবে সঠিক যত্ন নিলে হাড় দীর্ঘদিন সুস্থ ও শক্ত রাখা সম্ভব। বাংলাদেশে অনেক মানুষ হাড়ের সমস্যা যেমন অস্টিওপরোসিস, জয়েন্ট পেইন বা ফ্র্যাকচারের ঝুঁকিতে থাকেন, কিন্তু সচেতনতার অভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পান না। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের যত্ন নেওয়া শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং অত্যন্ত জরুরি।
হাড় কেন দুর্বল হয়?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে:হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যায়হরমোনের পরিবর্তন (বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর)শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া
এই পরিবর্তনগুলোর কারণে হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সাধারণ হাড়ের সমস্যাগুলো
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেসব সমস্যা বেশি দেখা যায় :
অস্টিওপরোসিস (হাড় পাতলা হয়ে যাওয়া)অস্টিওআর্থ্রাইটিস (জয়েন্টের ক্ষয়)বারবার হাড় ভেঙে যাওয়াকোমর, হাঁটু বা পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাশরীরের ভারসাম্য কমে যাওয়া
কীভাবে হাড়ের যত্ন নেবেন?
১. সঠিক খাবার গ্রহণ
হাড় সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ :
দুধ, দই, পনির (ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার)ছোট মাছ (কাঁটাসহ)ডিমসবুজ শাকসবজিবাদাম ও ডাল
২. ভিটামিন ডি নিশ্চিত করা
ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।
প্রতিদিন সকালে ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকাপ্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট নেওয়া
৩. নিয়মিত ব্যায়াম
হাড় শক্ত ও কার্যকর রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় :
হাঁটাস্ট্রেন্থ ট্রেনিং এক্সারসাইজব্যালেন্স ট্রেনিং এক্সারসাইজ
নিয়মিত ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে, পেশির শক্তি বাড়ায় এবং ভারসাম্য উন্নত করে ফলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
৪. সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা
ভুলভাবে বসা বা দাঁড়ানো হাড় ও জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।সোজা হয়ে বসাদীর্ঘ সময় একভাবে না থাকাকাজের মাঝে বিরতি নেওয়া
৫. ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
ধূমপান ও অ্যালকোহল হাড়ের ঘনত্ব কমিয়ে দেয় এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৬. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
অতিরিক্ত ওজন হাঁটু ও জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, ফলে দ্রুত ক্ষয় হয়।
ফিজিওথেরাপির ভূমিকা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে :
ব্যথা কমাতে সাহায্য করেজয়েন্টের নড়াচড়া স্বাভাবিক রাখেপেশি শক্তিশালী করেপড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়
বিশেষ করে যারা হাঁটু, কোমর বা পিঠের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য ফিজিওথেরাপি একটি কার্যকর ও নিরাপদ সমাধান।
কখন সতর্ক হবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত :
হঠাৎ ব্যথা বেড়ে যাওয়াসামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়াহাঁটতে সমস্যা হওয়াশরীরের উচ্চতা কমে যাওয়া
প্রতিদিনের কিছু সহজ অভ্যাস
প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটুনসিঁড়ি ব্যবহার করার অভ্যাস করুনভারসাম্য রক্ষার ব্যায়াম করুনপর্যাপ্ত পানি পান করুননিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান
বয়স বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, সচেতন জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে হাড়কে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব। আজ থেকেই সচেতন হোন। কারণ সুস্থ হাড় মানেই একটি সক্রিয়, স্বাধীন এবং সুস্থ জীবন।
লেখক : জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস
সময়ের আলো/আআ