খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গাছবান অমৃতপাড়া গ্রামের নিপা ত্রিপুরার গল্পটা আর দশজনের মতো নয়। পাহাড়ি জনপদের অনেক মেয়ের ভবিষ্যৎ যেখানে বিয়ে ও সংসারের প্রচলিত গণ্ডিতে আটকে যায়, সেখানে ২২ বছর বয়সি নিপা স্বপ্ন দেখেছেন ভিন্ন কিছু করার।
কৃষক বাবার সঙ্গে জুমের ক্ষেতে কাজ করার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই বিদ্যুতের তার, সুইচবোর্ড ও নষ্ট বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই একসময় তাকে করে তুলেছে দুর্গম পাহাড়ের এক আত্মনির্ভর তরুণী।
বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ভাইয়ের সঙ্গে বাবার কৃষিকাজে সহযোগিতা করতে শুরু করেন নিপা। পরিবারের আর্থিক অনটনের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০১৯ সালে খাগড়াছড়ি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তা পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০২১ সালে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে মহামারি ও চরম আর্থিক সংকটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ আর এগোয়নি।
জীবিকার তাগিদে খাগড়াছড়ি শহরের একটি কারুপণ্যের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন নিপা। কিন্তু তার ভেতরে তখনও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যাওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের মোড় ঘুরে যায় এক দিন জুম ক্ষেতে কাজ করার সময়। মাইকে প্রচারিত একটি ঘোষণায় জানতে পারেন বিনামূল্যে ইলেকট্রিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগের কথা।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) বাস্তবায়িত বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগের আওতায় খাগড়াছড়ির আনন্দ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে ‘ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ বিষয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণে ভর্তি হন নিপা। বাবার উৎসাহে ২০২৫ সালের আগস্টে শুরু হয় তার নতুন পথচলা।
সম্পূর্ণ আবাসিক এই প্রশিক্ষণের ২৫ জনের ব্যাচে মাত্র দুজন নারী ছিলেন। পুরুষপ্রধান এই কারিগরি প্রশিক্ষণে শুরুতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অস্বস্তি ও ভয় কাজ করত নিপার মধ্যে। বিশেষ করে বিদ্যুতের তার ধরতে ভয় লাগত। তবে প্রশিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা ও নিয়ম মেনে কাজ শেখার ফলে ধীরে ধীরে সেই ভয় কেটে যায়। নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়তে থাকে।
নিপা বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করতে পিকেএসএফ কাজ করছে। দারিদ্র্য বিমোচন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ বিভাগের আওতাধীন Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP) প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে পিকেএসএফ। এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তাদের এই প্রশিক্ষণের কারণে আজ আমি এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ‘সোলার অ্যান্ড কুকস্টোভ’ প্রকল্পে অ্যাসিস্ট্যান্ট সোলার টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নিপা। শুধু চাকরি করেই থেমে থাকেননি নিপা। নিজের সঞ্চয় ও ঋণের অর্থ দিয়ে একটি ধান মাড়াই মেশিন কিনেছেন। সেটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা বাড়তি আয় হচ্ছে পরিবারের। অর্থাৎ নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি পরিবারের আয় বাড়ানোর পথও তৈরি করেছেন তিনি।
তবে নিপার স্বপ্ন এখানেই শেষ নয়। নিজের উপার্জনের একটি অংশ নিয়মিত সঞ্চয় করছেন তিনি। ভবিষ্যতে খাগড়াছড়ির নিজের এলাকায় একটি ‘সোলার প্যানেল বিক্রয় ও সার্ভিসিং সেন্টার’ গড়ে তুলতে চান। তার লক্ষ্য শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, এলাকার বেকার যুবকদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করা।
পাহাড়ের এই তরুণীর গল্প তাই শুধু একজন নারীর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে দুর্গম এলাকার মেয়েরাও প্রযুক্তি ও কারিগরি পেশায় নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারেন। নিপার বিশ্বাস, ভয়কে জয় করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে সাফল্যের পথ তৈরি হয়। সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি আজ পাহাড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজের জীবনের আলো।
সময়ের আলো/জেডআই