ভেরা কুপার রুবিনের অদৃশ্য মহাবিশ্বের সন্ধান

তাসলিমা নীলু

ফিচার

রাতের আকাশে আমরা যা দেখি, মহাবিশ্ব তার চেয়েও অনেক বড়। তারা, গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ কিংবা দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও রয়েছে এমন এক

2026-09-02T15:35:27+00:00
2026-09-02T15:35:27+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
ভেরা কুপার রুবিনের অদৃশ্য মহাবিশ্বের সন্ধান
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩৫ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাতের আকাশে আমরা যা দেখি, মহাবিশ্ব তার চেয়েও অনেক বড়। তারা, গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ কিংবা দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও রয়েছে এমন এক অদৃশ্য জগৎ, যার অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন তার প্রভাব দেখে। এই রহস্যময় উপাদানের নাম ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা অদৃশ্য পদার্থ। এর অস্তিত্বের পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেরা কুপার রুবিন। তবে তার গল্প শুধু মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের নয়, বরং পুরুষপ্রধান বিজ্ঞানজগতে একজন নারীর নিজের জায়গা তৈরি করারও গল্প।

ভেরা রুবিন ১৯২৮ সালের ২৩ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসিতে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই রাতের আকাশ তাকে মুগ্ধ করত। কিশোরী বয়সে তার বাবা তাকে একটি টেলিস্কোপ তৈরি করতে সাহায্য করেন। সেই টেলিস্কোপ দিয়েই তার আকাশ পর্যবেক্ষণের শুরু। ধীরে ধীরে তার এই কৌতূহল পরিণত হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহে।

Advertisement
ভাসার কলেজ থেকে স্নাতক, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। কিন্তু সেই সময় একজন নারী হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণার পথ সহজ ছিল না। গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের নানা সুযোগ থেকে নারীরা প্রায়ই বঞ্চিত হতেন। ১৯৬৫ সালে ভেরা রুবিন প্রথম নারী হিসেবে কার্নেগি ইনস্টিটিউশনে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।

এরপর তার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। কার্নেগি ইনস্টিটিউশনে যোগ দেওয়ার পর যন্ত্রবিদ কেন্ট ফোর্ডের সঙ্গে তিনি গ্যালাক্সির ঘূর্ণন নিয়ে কাজ শুরু করেন। তারা অ্যান্ড্রোমিডাসহ বহু সর্পিল গ্যালাক্সির নক্ষত্র ও গ্যাসের গতিবেগ পরিমাপ করেন।

সেখানেই ধরা পড়ে বিস্ময়কর এক তথ্য। বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরে গেলে নক্ষত্রের গতি কমে আসার কথা। কিন্তু রুবিন ও ফোর্ডের পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, গ্যালাক্সির বাইরের নক্ষত্রগুলো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে ঘুরছে। তাদের গতি কেন্দ্রের কাছাকাছি নক্ষত্রগুলোর গতির মতোই রয়ে গেছে। এই অস্বাভাবিকতাই ‘ফ্ল্যাট গ্যালাক্টিক রোটেশন কার্ভ’ নামে পরিচিত হয়।

বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতিতে তিনি ১৯৮১ সালে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য হন এবং ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির গোল্ড মেডেল পাওয়া প্রথম নারী হন তিনি। নোবেল পুরস্কার না পেলেও তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তাতে একটুও কমেনি।

ভেরা রুবিন ছিলেন নারী বিজ্ঞানীদের পথপ্রদর্শকদের একজন। তিনি গবেষণাক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন এবং নতুন প্রজন্মের নারীদের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিয়েছেন। চার সন্তানের মা রুবিন পরিবার ও গবেষণাগারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলেছেন। তার চার সন্তানই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন।


২০১৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৮৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। চিলিতে নির্মিত ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি তার নাম বহন করছে। মহাবিশ্বের ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি ও আরও বহু রহস্য অনুসন্ধানে তার পর্যবেক্ষণ গবেষণাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভেরা রুবিনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান শুধু চোখে দেখা জিনিসের উত্তর খোঁজে না। কখনো কখনো যা দেখা যায় না, তার অস্তিত্বের প্রমাণও খুঁজে বের করতে হয়। আর সেই অদৃশ্য সত্যের সন্ধানে একজন নারীর সাহসী প্রশ্ন বদলে দিয়েছে মহাবিশ্বকে দেখার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

আকাশের অন্ধকারে ভেরা রুবিন শুধু ডার্ক ম্যাটারের ইঙ্গিত খুঁজে পাননি, ভেঙেছেন অদৃশ্য সামাজিক বাধার দেয়ালও। তার গল্প তাই মহাকাশের মতোই বিস্তৃত। তিনি সবাইকে উপলব্ধি করিয়েছেন, বাধা অদৃশ্য হলেও সাহস থাকলে সেটিও ভাঙা সম্ভব।

সময়ের আলো/জেডআই
  বিষয়:   মহাবিশ্ব  ভেরা কুপার রুবিন 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: