একসময় পুঁতির গহনা মানেই ছিল রঙিন মালা, কানের দুল কিংবা হাতের চুড়ি। সাজের বাক্সে পুঁতির তৈরি কিছু না কিছু থাকতই। কখনো পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে, কখনো আবার একেবারেই নিজের পছন্দের পুঁতির গহনা ছিল তরুণীদের সাজের পরিচিত অনুষঙ্গ। সময়ের সঙ্গে ফ্যাশনের ধারা বদলেছে। একসময় ঝলমলে মেটাল, স্টোন ও মিনিমাল জুয়েলারির দাপটে পুঁতির ব্যবহার অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। কিন্তু ফ্যাশন যে চক্রাকারে ফিরে আসে, তারই আরেকটি উদাহরণ এখন পুঁতির নতুন করে ফিরে আসা।
তবে এবারের পুঁতির ফ্যাশন আগের মতো নয়। পুরোনো দিনের রঙিন পুঁতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক নকশা, নতুন উপকরণ, ভিন্ন আকৃতি ও সৃজনশীল ডিজাইন। গহনা ছাড়িয়ে ব্যাগ, চুলের অ্যাক্সেসরিজ, বেল্ট, মোবাইল চার্ম, এমনকি পোশাকের অলংকরণেও জায়গা করে নিচ্ছে পুঁতি। ফলে পুরোনো পরিচিত পুঁতি এখন হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের ট্রেন্ডি ফ্যাশন উপকরণ।
হরেক রকম পুঁতি
পুঁতি বললেই যে শুধু ছোট গোলাকার রঙিন দানা বোঝাবে তা নয়। উপকরণ, আকার, রং ও ফিনিশের ওপর ভিত্তি করে পুঁতির রয়েছে নানা ধরন। কাচের পুঁতি, প্লাস্টিকের পুঁতি, কাঠের পুঁতি, অ্যাক্রিলিক পুঁতি, মুক্তার মতো দেখতে ফক্স পার্ল, ক্রিস্টাল, মেটাল এবং সিরামিকের পুঁতিও এখন বিভিন্ন ডিজাইনে ব্যবহার হচ্ছে।
ছোট আকারের পুঁতি দিয়ে তৈরি করা যায় সূক্ষ্ম নকশা। একটু বড় গোলাকার পুঁতি দিয়ে তৈরি হয় মালা বা চাঙ্কি নেকলেস। আবার চ্যাপ্টা, লম্বাটে, চৌকো, ফুল, হৃদয়, তারা, পাতার মতো আকৃতির পুঁতিও পাওয়া যায়। স্বচ্ছ পুঁতির মধ্যে রঙিন আভা, ধাতব ফিনিশ কিংবা চকচকে আবরণও নতুন ডিজাইনে আলাদা মাত্রা যোগ করছে।
রঙের খেলায় পুঁতির সৌন্দর্য
পুঁতির অন্যতম আকর্ষণ এর রঙের বৈচিত্র্য। একরঙা পুঁতির পাশাপাশি দুই বা ততোধিক রঙের কম্বিনেশন এখন বেশ জনপ্রিয়। সাদা ও সোনালি, কালো ও রুপালি, লাল ও সাদা, নীল ও সবুজ কিংবা প্যাস্টেল রঙের মিশ্রণে তৈরি গহনাগুলো যেমন নরম ও মার্জিত, তেমনি উজ্জ্বল রঙের পুঁতি দিয়ে তৈরি অ্যাক্সেসরিজ এনে দেয় নতুন প্রাণ।
বিশেষ করে প্যাস্টেল পিংক, ল্যাভেন্ডার, মিন্ট, বেবি ব্লু, ক্রিম ও পিচের মতো রং তরুণীদের ক্যাজুয়াল সাজে মানিয়ে যায়। অন্যদিকে লাল, কমলা, হলুদ, নীল কিংবা বেগুনির মতো উজ্জ্বল রঙের পুঁতি উৎসবের সাজে বেশি নজরকাড়ে।
গলায় ফিরেছে পুঁতির মালা
পুঁতির সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার নেকলেসে। তবে পুরোনো দিনের এক সারি মালার বদলে এখন দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের ডিজাইন। ছোট ছোট পুঁতি দিয়ে তৈরি মাল্টি-লেয়ার নেকলেস, বিভিন্ন রঙের কম্বিনেশন, মাঝখানে বড় পেনডেন্ট কিংবা ভিন্ন আকৃতির চার্মযুক্ত নেকলেস বেশ আকর্ষণীয়। কেউ চাইলে একাধিক ছোট মালা একসঙ্গে পরতে পারেন। আবার একটি লম্বা পুঁতির মালাকে কয়েকবার গলায় প্যাঁচিয়ে লেয়ারড লুকও তৈরি করা যায়। পুঁতির সঙ্গে মুক্তা, ধাতব চার্ম, অক্ষরের পেনডেন্ট, ফুল বা হৃদয় আকৃতির পুঁতি যুক্ত করলে তৈরি হয় আরও ইউনিক নকশা।
পোশাকে পুঁতির ছোঁয়া
গহনা ও অ্যাক্সেসরিজের বাইরে পোশাকেও ফিরছে পুঁতির কাজ। শাড়ির আঁচল, ব্লাউজের হাতা, গলার অংশ কিংবা ওড়নার কিনারায় ছোট পুঁতির কাজ পোশাককে দেয় সূক্ষ্ম সৌন্দর্য। বিশেষ অনুষ্ঠানের পোশাকে পুঁতি, সিকুইন ও অ্যামব্রয়ডারির সমন্বয় তৈরি করতে পারে জমকালো লুক। আবার দৈনন্দিন পোশাকে খুব বেশি পুঁতি না ব্যবহার করে ছোট কোনো অংশে পুঁতির কাজ রাখা হলে সাজটি থাকে আধুনিক ও পরিমিত।
কানের দুলেও নতুনত্ব
পুঁতির দুলও ফিরে এসেছে নতুন রূপে। ছোট হুপের সঙ্গে পুঁতি ঝুলিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সহজ কিন্তু আকর্ষণীয় ডিজাইন। আবার ফুলের পাপড়ি, প্রজাপতি, ফল, পাখি কিংবা জ্যামিতিক আকৃতির পুঁতি দিয়ে তৈরি দুলও নজর কাড়ছে। বড় সাইজের পুঁতির দুলে পাওয়া যাচ্ছে স্টেটমেন্ট লুক। অন্যদিকে ছোট স্টাড বা মিনিমাল ড্যাংলার দুল অফিস কিংবা প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য বেশ মানানসই। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কানের দুল বেছে নিলে পুরো সাজে আসে সমন্বিত ভাব।
হাতে পুঁতির ব্রেসলেট
পুঁতির ব্রেসলেট এখন কেবল একটি সাধারণ মালা নয়। নামের আদ্যক্ষর, জন্ম মাসের প্রতীক, ছোট চার্ম, হৃদয়, তারা বা ফুল যুক্ত করে তৈরি করা যায় ব্যক্তিগত ব্রেসলেট। এক হাতে কয়েকটি ভিন্ন রঙের ব্রেসলেট পরার প্রবণতাও ফিরে এসেছে।
বন্ধুদের জন্য একই ধরনের ব্রেসলেট, দম্পতির জন্য মিলিয়ে তৈরি করা ডিজাইন কিংবা নিজের নামের অক্ষর দিয়ে বানানো ব্রেসলেট ইত্যাদি সবই এখন ফ্যাশনের অংশ হতে পারে।
চুলের সাজেও পুঁতি
পুঁতির নতুন ব্যবহারগুলোর মধ্যে চুলের অ্যাক্সেসরিজ বেশ নজরকাড়া। পুঁতির তৈরি হেয়ার ক্লিপ, হেয়ারপিন, হেডব্যান্ড, চুলের চেইন কিংবা বিনুনিতে জড়িয়ে নেওয়ার বিডেড স্ট্রিং সাজকে আলাদা করে তুলতে পারে। বিশেষ করে উৎসব বা পার্টির সাজে চুলের সঙ্গে ছোট মুক্তার মতো পুঁতি ব্যবহার করলে তৈরি হয় কোমল অথচ স্টাইলিশ লুক।
ব্যাগে পুঁতির কারুকাজ
পুঁতির ব্যাগ বর্তমানে এই ট্রেন্ডের অন্যতম আকর্ষণ। পুরো ব্যাগই পুঁতি দিয়ে তৈরি হতে পারে। আবার কাপড় বা সিনথেটিক উপকরণের ব্যাগের ওপর পুঁতির ফুল, ফল, পাতা কিংবা জ্যামিতিক নকশা বসিয়েও তৈরি করা হচ্ছে ইউনিক ডিজাইন। ছোট বিডেড ক্লাচ, পার্টি ব্যাগ, মিনি ব্যাগ কিংবা মোবাইল ব্যাগসহ সব ধরনের ব্যাগেই পুঁতির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান বা পার্টির পোশাকের সঙ্গে ছোট পুঁতির ব্যাগ বেশ আকর্ষণীয়।
পুরোনো স্মৃতি, নতুন স্টাইল
ফ্যাশনে পুঁতির ফিরে আসা আসলে পুরোনোকে নতুন করে দেখার গল্প। যে পুঁতি একসময় ছিল কিশোরী কিংবা তরুণীদের সহজ-সরল সাজের অংশ, সেটিই এখন নতুন নকশা, রং ও ব্যবহারে আধুনিক ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন সচেতনরা চাইলে পুঁতিকে খুব সাধারণভাবেও ব্যবহার করতে পারেন। সাদা পোশাকের সঙ্গে রঙিন ব্রেসলেট, কুর্তির সঙ্গে ছোট পঁতির দুল কিংবা শাড়ির সঙ্গে মুক্তার মতো পুঁতির মালা। আবার যারা একটু সাহসী, তারা বেছে নিতে পারেন চাঙ্কি নেকলেস, মাল্টি-লেয়ার জুয়েলারি বা চোখে পড়ার মতো বিডেড ব্যাগ।
সব মিলিয়ে পুঁতির নতুন এই অধ্যায় যেন পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া আর বর্তমান সময়ের সৃজনশীলতার এক সুন্দর মেলবন্ধন। ফ্যাশনের দুনিয়ায় অনেক ট্রেন্ড আসে, কিছু হারিয়ে যায়, আবার কোনো কোনো ট্রেন্ড নতুন রূপে ফিরে আসে। পুঁতিও তেমনই। সে এবার শুধু ফিরে আসেনি, বরং নিজের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। তাই সাজে একটু রং, একটু মজা আর একটু ব্যক্তিত্ব যোগ করতে চাইলে পুঁতির তৈরি কোনো অ্যাক্সেসরিজ হতে পারে এবারের ফ্যাশন পছন্দের দারুণ একটি সংযোজন।
সময়ের আলো/এসএকে