একসময় চিঠি ছিল দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এখন সময় বদলেছে, চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বললেই চলে। তবু, আজও তার আবেদন ফুরোয়নি। সবার প্রিয় এই যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে হয়ে উঠেছিল আমাদের আপনজন, আজ জানব সেই ইতিহাস।
ধারণা করা হয়, প্রায় ৫ হাজার বছর আগে খ্রিষ্টপূর্ব যুগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়, বর্তমান ইরাক অঞ্চলে, বার্তা আদান-প্রদানের জন্য লেখা ব্যবহার শুরু হয়। তখন মানুষ কাদামাটির ফলকে বার্তা লিখত। পরে সেগুলো শুকিয়ে বা পুড়িয়ে শক্ত করা হতো, যাতে বহু বছর ধরে লেখাগুলো টিকে থাকে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলোই মানবসভ্যতার প্রাচীনতম লিখিত বার্তার অন্যতম নিদর্শন।
শুধু মেসোপটেমিয়াতেই নয়, প্রাচীন মিসরেও প্যাপিরাসের ওপর চিঠি লেখা হতো। অন্যদিকে, চীনে প্রথমদিকে বাঁশের ফালি ও সিল্কের কাপড়ে লেখা হতো নানা বার্তা। পরে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকের দিকে কাগজের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিঠির জগতেও আসে বড় পরিবর্তন। ধীরে ধীরে কাগজের চিঠি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও যোগাযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
চিঠির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে সংগঠিত ডাকব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৬শ শতাব্দীতে সেখানে ডাকব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। ইংল্যান্ডে ১৬৩৫ সালে সাধারণ মানুষের জন্য রাজকীয় ডাকব্যবস্থা উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৪০ সালে ইংল্যান্ডে চালু হয় ডাকটিকিটের ব্যবহার। সেই সময়ের ‘পেনি ব্ল্যাক’ আজও বিশ্বের প্রথম ডাকটিকিট হিসেবে বিখ্যাত।
আমাদের এই অঞ্চলেও চিঠির ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। প্রাচীন ভারতবর্ষে রাজা-বাদশাহদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল লিখিত বার্তা ও দূত। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য যুগে সম্রাট অশোকের সময় থেকেই দূতের মাধ্যমে বিভিন্ন আদেশ ও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচলন ছিল। ঘোড়সওয়ার দূতরা রাজপ্রাসাদ থেকে দূর-দূরান্তে খবর নিয়ে যেত।
মধ্যযুগে সুলতানি ও মোগল আমলে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। মোগলদের আমলে ‘ডাকচৌকি’ নামে বার্তা আদান-প্রদানের বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। নির্দিষ্ট দূরত্বে দূরত্বে চৌকি থাকত এবং সেখানে ঘোড়া ও দূত প্রস্তুত থাকত। একজন দূত খবর নিয়ে এসে পৌঁছালে, অন্যজন নতুন ঘোড়ায় চড়ে সেই বার্তা নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যে রওনা দিত। এভাবে তুলনামূলক কম সময়ে দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হতো।
বাংলার ডাকব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে ব্রিটিশ আমলে। ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় প্রথম সরকারি ডাকঘর স্থাপন করে। এরপর ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ডাকঘরের শাখা। সাধারণ মানুষের জন্য দূরে থাকা স্বজনদের কাছে চিঠি পাঠানো অনেক সহজ হয়ে যায়।
১৮৫৪ সালে ভারতীয় ডাকব্যবস্থায় আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। চালু হয় ডাকটিকিটের ব্যবহার। কয়েক পয়সার একটি টিকিট লাগিয়ে সাধারণ মানুষ দূরে থাকা আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনের কাছে খবর পাঠাতে পারত। ধীরে ধীরে চিঠি হয়ে ওঠে প্রেম, বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে আপন মাধ্যম।
সময়ের আলো/মহু