আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ভেজাল খাবার’। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি, ফলমূল এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধে পর্যন্ত ভেজালের থাবা বিস্তৃত। প্রতিদিনের খাবারে অজান্তেই মিশে যাচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শহর থেকে গ্রাম- সব জায়গাতেই এই ঝুঁকি বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি কেবল হুমকি নয়, বরং একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ভেজাল খাবার কী ও কেন বিপজ্জনক
ভেজাল খাবার বলতে এমন খাবারকে বোঝায়, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর বা নিম্নমানের উপাদান মেশানো হয়। যেমন- ফল দ্রুত পাকাতে কার্বাইডের ব্যবহার, দুধে পানি বা ডিটারজেন্ট মেশানো, মসলায় রং বা ইটের গুঁড়া মেশানো ইত্যাদি। এসব ভেজাল শুধু খাবারের গুণগত মান নষ্ট করে না, বরং শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্যের ওপর ভেজাল খাবারের প্রভাব
চিকিৎসকদের মতে, খাবারে মেশানো রাসায়নিক উপাদানগুলো মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ধীরে ধীরে বিকল করে দেয়। খাদ্যে ভেজাল হিসেবে সাধারণত ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, টেক্সটাইল ডাই, ইউরিয়া এবং ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। ভেজাল খাবার খাওয়ার ফলে প্রথমে হালকা সমস্যা যেমন পেট ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন খেলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।
লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেহরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়েশিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়
পুষ্টিবিদ হৈমন্তী সরকার বলেন, ভেজাল খাবারের ক্ষতি অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তাই মানুষ শুরুতে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু নিয়মিত এসব খাবার খেলে শরীরে বিষ জমতে থাকে, যা পরবর্তীতে জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্য নির্বাচনে সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সচেতনতাই প্রধান প্রতিরোধ
সরকারের কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি ব্যক্তিগত পর্যায়ের সচেতনতাও অপরিহার্য। চিকিৎসকরা বাজারের চকচকে ও অস্বাভাবিক উজ্জ্বল খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। ভেজাল খাবার থেকে বাঁচতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। যেমন :
অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা অসময়ে পেকে যাওয়া ফল এড়িয়ে চলা উচিত। রান্নার আগে শাকসবজি অন্তত ১৫-২০ মিনিট লবণ মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ক্ষতিকর কেমিক্যালের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।খোলা অবস্থায় বিক্রি হওয়া খাবার বা রাস্তার ধারের শরবত-আইসক্রিম টাইফয়েড ও জন্ডিসের প্রধান উৎস। এগুলো পরিহার করাই ভালো। খোলা খাবারের বদলে প্যাকেটজাত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করা।ফ্রোজেন ফুড বা টিনজাত খাবার কেনার আগে অবশ্যই মেয়াদ এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স (বিএসটিআই অনুমোদিত কি না) দেখে নিতে হবে।
সেই সঙ্গে অস্বাভাবিক রং বা গন্ধযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, দুধ বা তেল কেনার সময় নির্ভরযোগ্য উৎস বেছে নেওয়া ও রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর খাবার কম খাওয়া।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা পেতে আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা জরুরি। বাইরের প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাড়িতে তৈরি তাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। সম্ভব হলে বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় ছোট পরিসরে সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ খাবারের বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করাও জরুরি। ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সময়ের আলো/আআ