আমাদের দেশের পুরোনো সিনেমাগুলোর অধিকাংশই যখন টেলিভিশন অথবা ইউটিউবে দেখা হয়, তখন দেখা যায়–সেগুলোর প্রিন্ট অস্পষ্ট, পর্দায় দাগ। কিছু ছবির ফ্রেমে আবার অভিনয়শিল্পীদের মাথার উপরের অংশ কাটা থাকে।
আমরা কি কখনো ভেবেছি, কেন এমন হয়? হয়তো অনেকেরই ধারণা, আগের দিনে সিনেমা তৈরির জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ছিলো না, তাই সেগুলোর মান এমন খারাপ। খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার সিনেমাগুলোতেও ভারতে পরিষ্কার প্রিন্ট দেখা যায়, কিন্তু বাংলাদেশের প্রিন্ট থাকে অস্পষ্ট। অথচ, বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাউন্ডহে গার্ডেন সিন’ আজও পরিষ্কার প্রিন্টে দেখা যায়। বাংলাদেশের পুরনো সিনেমার এমন বেহাল দশার পেছনের কারণগুলো খুঁজতে গিয়ে জানা যায়-
ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অবহেলা
অতীতে বেশিরভাগ সিনেমা স্বল্পমূল্যে ভিডিও কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করে দিতো প্রযোজকরা। তারা সিনেমা হলের পর্দায় সেই সিনেমা চালিয়ে, ভিডিও ক্যামেরায় রেকর্ড করে ডিজিটালে রূপান্তর করতেন। অর্থাৎ, সিনেমার মূল কপি থেকে ডিজিটালে রূপান্তর করা হতো না। ফলে, টিভি বা ইউটিউবে সেসব সিনেমা ঘোলা দেখায়।
সংরক্ষণের অভাব
প্রযোজকরা সাধারণত রাইটস বিক্রি করে দেওয়ার পর সিনেমাগুলো ভালো করে সংরক্ষণ করতেন না। এতে, অনেক সিনেমার প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। পরবর্তীতে সেগুলো ডিজিটালে রূপান্তরের চেষ্টা করা হলেও, আউটপুট খারাপ এসেছে।
রঙের সীমাবদ্ধতা
সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে, ২০ বছরের বেশি পুরনো রঙিন ফিল্মগুলোর রঙ স্থায়ী হয় না। ফলে দৃশ্যগুলো ফিকে ও ঝাপসা দেখায়।
লাইফ সাইকেল মেনে না চলা
৩৫ মি.মি. যুগে প্রতিটা সিনেমার একটা মূল কপি থাকত। যার নাম ছিল নেগেটিভ। আর সিনেমা হলে চালানোর জন্য যে কপিগুলো হতো, সেগুলোকে বলা হতো পজেটিভ। একেকটা পজেটিভের লাইফ সাইকেল ছিল ৫০ বারের মতো। কিন্তু, তা চালানো হতো অসংখ্যবার। প্রতিবার চলার পর কপিগুলোতে দাগ পড়ে যেত। ফলে, আজ আমরা পুরনো দিনের ছবি স্পষ্ট দেখতে পারি না।
জেনারেশন লস
নেগেটিভ থেকে পজেটিভে রূপান্তরের সময় রেজ্যুলেশন ৬০ শতাংশ কমে যেত। পুরনো সিনেমাগুলো যখন এক প্রিন্ট থেকে অন্য প্রিন্টে নকল বা কপি করা হতো, তখন প্রতিবারই এভাবে ছবির মান কমতে থাকতো। একে 'জেনারেশন লস' বলা হয়, যা ছবিকে ঘোলাটে করে তোলে।
স্বল্পমূল্যের কেমিক্যাল ব্যবহার
৩৫ মি.মি. সিনেমা শুটিংয়ের পর রাশ প্রিন্ট যেসব কেমিক্যাল দিয়ে ওয়াশ করা হতো, তার মধ্যে অন্যতম ছিল সোডিয়াম থায়োসালফেট। বাজারে বিভিন্ন দামে তা পাওয়া যেতো। বেশিরভাগই কম দামি কেমিক্যাল ব্যবহার করতেন। এতে, সিনেমার প্রিন্ট খারাপ হয়ে যেতো।
প্রযোজক ও ভিডিও কোম্পানির অনীহা
বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের কাছে চলচ্চিত্র সংরক্ষণ ও রূপান্তরের জন্য উন্নত প্রযুক্তির মেশিন রয়েছে। যেগুলোর দাম প্রায় ২০ কোটি। অনেক সিনেমার ভালো প্রিন্ট বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের তত্ত্বাবধানে ডিজিটালি রূপান্তর করা আছে। কিন্তু, প্রযোজক কিংবা ভিডিও কোম্পানিগুলো সে ব্যাপারে আগ্রহী নয়।
ফিল্ম আর্কাইভ সরাসরি কারও সিনেমা ডিজিটালে রূপান্তর না করলেও, তাদের কাছে সিনেমার কোনো কপি যদি কেউ জমা দেয়, তাহলে তারা ফ্রিতে একটা কপি ডিজিটালে রূপান্তর করে, প্রযোজকরা চাইলে তাদের দেয়। এরজন্য প্রযোজকদের বাড়তি কোনো খরচ লাগে না। তবুও, তাদের ভেতর অনীহা দেখা যায়।
/মহু