সারা দেশে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সক্রিয় সহায়তা চেয়েছে সরকার। সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ডিসি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে এ আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কগুলো ধাপে ধাপে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার সিদ্ধান্তের কথাও ডিসিদের জানানো হয়েছে। এ ছাড়া টানা বর্ষণে হাওড় অঞ্চলসহ কয়েকটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক লাখ পরিবারকে চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
সম্মেলন শেষে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রশাসন ও নির্বাচিত সরকারের সমন্বয়ে কীভাবে এসব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি ডিসিদের বাজার তদারকি জোরদার করে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক ও খুচরা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। গত পাঁচ দশকে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাব ছিল। এ অবস্থায় সরকার প্রথমবারের মতো আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা একটি এআইভিত্তিক মডেলের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে ধারাবাহিক বাজার পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে।
আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় এ খাতে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এক বছরের মধ্যে ৫০ কারখানা বেসরকারি খাতে
বস্ত্র ও পাট খাতের প্রায় ৫০টি বন্ধ ও রুগ্ন কারখানা পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আগামী এক বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, শিল্প খাত পুনরুজ্জীবন, বাজার স্থিতিশীলতা এবং জরুরি পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ডিসিরা শিল্প পুনরুজ্জীবন, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বন্ধ চিনিকল চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন, যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। টিসিবির কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
কুরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ
আসন্ন কুরবানির ঈদ উপলক্ষে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ, সরকারিভাবে লবণ সরবরাহ, সচেতনতামূলক প্রচার ও গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হবে, যাতে একটি চামড়াও নষ্ট না হয়।
দুই বছরের কৌশলগত কাঠামো : পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানান, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও ৩১ দফার আলোকে দুই বছর মেয়াদি নতুন কৌশলগত কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বৈষম্য হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এ পরিকল্পনার লক্ষ্য।
ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বড় প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ বড় বাধা : সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ অন্যতম সমস্যা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ সময়েও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি।
মন্ত্রী রাস্তার দুই পাশে অবৈধ দখল, বাজার বসা, অতিরিক্ত মালবাহী যান চলাচল এবং অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণে ডিসিদের আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া যত্রতত্র স্পিড ব্রেকার নির্মাণ বন্ধে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণের ওপর জোর দেন।
বজ্রপাতে ক্ষতি কমাতে শেল্টার নির্মাণ : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, হাওড়সহ কয়েকটি জেলায় বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বজ্রপাতের ঝুঁঁকি মোকাবিলায় হাওড় ও উত্তরাঞ্চলে কৃষকদের জন্য শেল্টার নির্মাণ এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মাছের অভয়ারণ্য ও কৃষি উন্নয়ন : মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশি মাছ রক্ষায় গ্রামভিত্তিক অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা ও কীটনাশক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হবে।
পর্যটন খাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানান, জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। দেশে ১,৭৪২টি পর্যটন স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে এবং একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।
পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ডিসিরা নিজ নিজ জেলায় উন্নয়নের অগ্রদূত হতে পারেন এবং নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন।
সম্মেলনে উপস্থিতি : মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ ছাড়া সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম ও প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।