সঞ্চয়ের সহজ উপায়

নিবেদিতা দাস

ফিচার

বর্তমান সময়ে বাজারদর আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে মাসের শেষে পকেটে কিছু টাকা উদ্বৃত্ত রাখা রীতিমতো একটি শিল্প। আগে

2026-05-05T03:44:19+00:00
2026-05-05T03:44:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
সঞ্চয়ের সহজ উপায়
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ৩:৪৪ এএম  আপডেট: ০৫.০৫.২০২৬ ৩:৪৪ এএম
সংগৃহীত ছবি
বর্তমান সময়ে বাজারদর আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে মাসের শেষে পকেটে কিছু টাকা উদ্বৃত্ত রাখা রীতিমতো একটি শিল্প। আগে সঞ্চয় বলতে আমরা বুঝতাম খরচের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা জমিয়ে রাখা। কিন্তু আধুনিক লাইফস্টাইলে এই ধারণা বদলে গেছে। শুধু টাকা জমিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন ‘স্মার্ট সেভিংস’। পরিকল্পিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সঞ্চয়, যা আপনার বর্তমান জীবনযাত্রা বজায় রেখেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ জীবনযাত্রার মান বজায় রেখে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খরচ কমিয়ে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা।

কেন স্মার্ট সেভিংস জরুরি : 

অনেকেই মাস শেষে যা থাকে, তা সঞ্চয় করেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সঞ্চয় ধারাবাহিক হয় না। স্মার্ট সেভিংসের মূল ধারণা হলো- Save first, spend later। অর্থাৎ আয় হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অংশ সঞ্চয়ের জন্য আলাদা করে রাখা। এতে করে জরুরি প্রয়োজনে হঠাৎ অর্থ সংকটে পড়তে হয় না। বর্তমান সময়ে চাকরির অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে একটি সুরক্ষিত সঞ্চয় পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্চয় মানে কেবল টাকা জমানো নয় : 

স্মার্ট সেভিংস মানে কেবল কৃপণতা নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল জীবন দর্শনের অংশ। অপ্রয়োজনীয় খরচ ছেঁটে ফেলে জীবনের লক্ষ্যগুলোর (যেমন- নিজের বাড়ি, সন্তানের শিক্ষা বা অবসর জীবন) দিকে এগিয়ে যাওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। এটি আপনাকে আর্থিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি দেয়।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের কাস্টমার এক্সপিরিয়েন্স বিভাগের ব্যবস্থাপক সুলতানা রাজিয়া বলেন, বর্তমান সময়ে স্মার্ট সেভিংস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। স্মার্ট সেভিংস মানুষকে শুধু টাকা জমাতে নয়, বরং সঠিকভাবে সেই সঞ্চয়কে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। আগের তুলনায় মানুষ এখন সঞ্চয় সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে স্মার্ট সেভিংস, ডিপিএস, এফডিআর ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। তবে এখনও একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে এই ধারণা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। অনেকেই সঞ্চয় করেন, কিন্তু সেটিকে কীভাবে আরও কার্যকর ও লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্মার্ট সেভিংস স্কিমের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি গ্রাহকের আয়, লক্ষ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সঞ্চয় পরিকল্পনা দিতে, যাতে তারা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত আর্থিক ভিত্তি তৈরি করতে পারেন।

কীভাবে শুরু করবেন : 

স্মার্ট সেভিংস শুরু করতে বড় অঙ্কের টাকা দরকার হয় না। ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই বড় সঞ্চয় গড়ে ওঠে।

৫০-৩০-২০ নিয়ম : আয়ের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো থাকা জরুরি। আপনার মোট আয়ের ৫০ শতাংশ ব্যয় করুন জীবন ধারণের মৌলিক প্রয়োজনে (বাসা ভাড়া, খাবার, ইউটিলিটি বিল), ৩০ শতাংশ ব্যয় করুন নিজের শখ বা বিনোদনে এবং বাকি ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে সঞ্চয় বা বিনিয়োগে রাখুন। মাস শুরুর প্রথমেই এই ২০ শতাংশ সরিয়ে ফেলা হলো স্মার্ট সেভিংসের প্রথম ধাপ।

বাজেটিং অ্যাপ ও ট্র্যাকিং : 

আমরা অনেক সময় ছোটখাটো খরচগুলোকে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু দিনের শেষে চা-নাশতা বা অপ্রয়োজনীয় অনলাইন অর্ডারের টাকা মাস শেষে বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। স্মার্টফোনে বিভিন্ন বাজেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতিদিনের খরচের হিসাব রাখুন। এতে মাসের মাঝপথে গিয়ে ‘টাকা কোথায় গেল’ এই দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন বাতিল : বর্তমানে আমরা বিনোদনের জন্য নেটফ্লিক্স, হইচই বা বিভিন্ন জিম মেম্বারশিপ নিয়ে রাখি যা হয়তো নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। এই ‘অদৃশ্য’ খরচগুলো বন্ধ করলে বছরে বড় অঙ্কের সাশ্রয় সম্ভব।

অটোমেটিক সেভিংস : 

ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অটো-ডেবিট চালু করে রাখলে নির্দিষ্ট সময় পরপর টাকা সঞ্চয়ে চলে যাবে।

কেনাকাটায় বুদ্ধিমত্তা : 

সুপারশপ বা অনলাইন সেলের প্রলোভনে পড়ে আমরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে ফেলি। কেনাকাটা করতে যাওয়ার আগে একটি তালিকা তৈরি করুন। ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ অফার দেখে সেটিই কিনুন যা আপনার আসলেই প্রয়োজন। পচনশীল নয় এমন পণ্য পাইকারি বাজার থেকে একবারে কিনে রাখলে অনেকটা সাশ্রয় হয়।

বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ : 

লাইফস্টাইলে ছোট পরিবর্তন বড় সঞ্চয় আনে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ফ্যান-লাইট বন্ধ করা, এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখা এবং পানির অপচয় কমানো- এগুলো কেবল পরিবেশের জন্যই নয়, আপনার মানিব্যাগের জন্যও ভালো।

অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো : 

প্রতিদিনের ছোটখাটো খরচ, যেমন অপ্রয়োজনীয় অনলাইন শপিং বা অতিরিক্ত বাইরে খাওয়া- এগুলো কমালেই মাস শেষে ভালো অঙ্কের সঞ্চয় সম্ভব।

প্রযুক্তির ব্যবহার : 

বর্তমানে বিভিন্ন অ্যাপ ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা স্মার্ট সেভিংসকে সহজ করে দিয়েছে। খরচ ট্র্যাক করা, বাজেট তৈরি করা কিংবা বিনিয়োগের সুযোগ- সবকিছু এখন হাতের মুঠোয়। ফলে সঞ্চয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা অনেক সহজ হয়েছে।

বিনিয়োগ যখন সঞ্চয়ের পরিপূরক : 

শুধু সঞ্চয় করলেই হবে না, সেই টাকা কীভাবে বাড়বে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের সঞ্চয় হিসাব ছাড়াও আপনি সঞ্চয়পত্র, ফিক্সড ডিপোজিট বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। এতে করে আপনার টাকার ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফা আসবে। অনেকেই শুধু টাকা জমিয়ে রাখেন, কিন্তু বিনিয়োগের কথা ভাবেন না। ফলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার প্রকৃত মূল্য কমে যায়। তাই সঞ্চয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ জরুরি। 

কেনাকাটায় ‘৩০ দিনের নিয়ম’ : 

অনেক সময় হুট করে দামি কোনো গেজেট বা পোশাক পছন্দ হয়ে যায়। স্মার্ট সেভিংসের একটি চমৎকার নিয়ম হলো ‘৩০ দিনের নিয়ম’। কোনো দামি জিনিস পছন্দ হলে তৎক্ষণাৎ না কিনে ৩০ দিন অপেক্ষা করুন। এক মাস পর যদি দেখেন সেই জিনিসের প্রয়োজনীয়তা এখনও অনুভব করছেন, তবেই সেটি কিনুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কয়েক দিন পর সেই জিনিসের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং অহেতুক খরচ বেঁচে যায়।

জনতা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক উম্মে রোকসানা বলেন, সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই শুরু করেন, কিন্তু কয়েক দিন পর বন্ধ করে দেন। নিয়মিত ছোট অঙ্কের সঞ্চয়ই দীর্ঘমেয়াদে বড় নিরাপত্তা তৈরি করে। 

স্মার্ট সেভিংস কোনো কঠিন বিষয় নয়, বরং সচেতনতার বিষয়। আজকের ছোট পদক্ষেপই আগামী দিনের বড় নিরাপত্তা তৈরি করে। তাই আয় যতই কম হোক না কেন, পরিকল্পনা করে সঞ্চয় শুরু করুন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে নেওয়া একটি ছোট সিদ্ধান্তই আপনার ভবিষ্যৎকে অনেক বেশি স্থিতিশীল করে তুলতে পারে।


  বিষয়:   স্মার্ট সেভিংস  সঞ্চয় 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: