কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে এখনও বঞ্চিত চরের মানুষ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনো স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রসববেদনা শুরু হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীকে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে নিতে হয় সদর হাসপাতালে। এ যাত্রা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, সময়সাপেক্ষও। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। শুধু প্রসূতি নয়, সাধারণ অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রেও একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, জনবল সংকট ও দুর্গম অবস্থানের কারণে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে উপ-সহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা সপ্তাহে দুদিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারি বলেন, চরে এখনও কোনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায়নি। গুরুতর রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি জানান তিনি।
সরেজমিন দেখা যায়, নদীপথই চরের মানুষের একমাত্র ভরসা। খেয়া নৌকা ছাড়া অন্য কোনো নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ বাসিন্দা কৃষি ও মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত হলেও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবার অভাব তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সামান্য রোগের চিকিৎসার জন্যও কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় অনেকেই ঝাড়ফুঁক বা হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। গুরুতর রোগী হলে ভরসা শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তবে সেখানে পৌঁছানো বড্ড কঠিন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে পদ্মায় জেগে ওঠে চরজানাজাত। পরের বছর থেকে শুরু হয় বসতি। চর থেকে মূল ভূখণ্ডে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর স্রোত এবং নৌযানের সংকট- সব মিলিয়ে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নেই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন গর্ভবতী নারীরা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করেন। এতে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। শিশুদের জন্য নেই কার্যকর কোনো চিকিৎসাসেবা।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, এখানে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিছুই নেই। বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো উপায় নেই। নদী পার হতে অনেক সময় চলে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত। আধুনিক সুবিধাসংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
/এসএকে