ভালোবাসায় গড়া মা-সন্তানের বন্ধুত্ব

তাসলিমা নীলু

আনন্দ সময়

পৃথিবীতে প্রতিটি সম্পর্কের ভিত্তি আলাদা হলেও মা ও সন্তানের সম্পর্কেও কোনো তুলনা হয় না। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই সম্পর্ক মায়া,

2026-05-06T03:36:36+00:00
2026-05-06T03:53:03+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আনন্দ সময়
ভালোবাসায় গড়া মা-সন্তানের বন্ধুত্ব
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৩:৩৬ এএম  আপডেট: ০৬.০৫.২০২৬ ৩:৫৩ এএম
ইয়াশ রোহান ও তার মা। ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীতে প্রতিটি সম্পর্কের ভিত্তি আলাদা হলেও মা ও সন্তানের সম্পর্কেও কোনো তুলনা হয় না। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই সম্পর্ক মায়া, মমতা আর ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। তবে সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কের ধরনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। একসময় মায়ের পরিচয় ছিল কেবলই একজন অভিভাবক বা শাসনকর্তা হিসেবে। 

কিন্তু বর্তমান যুগের জটিল সামাজিক প্রেক্ষাপটে মা ও সন্তানের মাঝে একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের’ প্রয়োজনীয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় পরিবর্তন 

মা ও সন্তানের বন্ধুত্ব মানে এই নয় যে মা তার অভিভাবকত্বের স্থান হারাবেন বরং এটি এমন একটি পর্যায় যেখানে শাসনের চেয়ে বেশি জায়গা পায় সহমর্মিতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান কোনো ভুল করলে বা বিপদে পড়লে শাসনের ভয়ে মায়ের কাছে তা গোপন করে। এই গোপন করার প্রবণতা থেকেই দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু মা যদি সন্তানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ বন্ধু হন, তবে সন্তান তার অন্ধকার সময়ের কথাগুলোও অকপটে বলতে পারে। এই আস্থার নামই হলো বন্ধুত্ব।

বন্ধুত্বের ভিত্তি : শোনা এবং বোঝা 

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রথম শর্ত হলো ‘ভালো শ্রোতা’ হওয়া। অধিকাংশ সময় মায়েরা সন্তানদের কেবল উপদেশ দিতে চান কিন্তু তাদের মনের কথা শুনতে ভুলে যান। সন্তান সারাদিন কী করল, তার কার সঙ্গে ঝগড়া হলো বা কার ওপর তার ভালো লাগা তৈরি হলোÑ এই ছোট ছোট বিষয়গুলো যখন মা আগ্রহ নিয়ে শুনবেন, তখন সন্তানের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে ‘আমার কথা শোনার জন্য একজন মানুষ আছেন’।

মাঝেমধ্যে সন্তানদের কথাগুলো তুচ্ছ মনে না করে তাদের জায়গা থেকে চিন্তা করা উচিত। জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মের ব্যবধান দূর করার একমাত্র উপায় হলো সহানুভূতিশীল হওয়া। মনে রাখতে হবে, আপনি যখন আপনার সন্তানের বন্ধু হবেন, তখন আপনি কেবল একজন মা নন বরং আপনি তার একজন দিকনির্দেশক এবং জীবনের প্রধান মেন্টর হয়ে উঠবেন।

শাসনের সঙ্গে বন্ধুত্বের ভারসাম্য

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মা যদি বন্ধুর মতো মিশে তবে কি সন্তান শাসনের বাইরে চলে যাবে? 

উত্তরটি হলো, না।  বন্ধুত্বের অর্থ এই নয় যে সন্তানকে যা খুশি তাই করতে দেওয়া হবে বরং বন্ধুত্বপূর্ণ শাসনের প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী। একজন বন্ধু যখন ভুল ধরিয়ে দেয়, তখন তা মেনে নেওয়া সহজ হয় কিন্তু একজন একনায়ক যখন আদেশ দেয়, তখন তা বিদ্রোহের জন্ম দেয়।

সন্তানকে জীবনের মূল্যবোধ শেখানো, নিয়মানুবর্তিতা এবং নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া মায়ের দায়িত্ব। তবে সেই শিক্ষা হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, তর্কের মাধ্যমে নয়। সন্তানকে এটা বুঝতে দিতে হবে যে, মা তাকে ভালোবাসেন বলেই বাধা দিচ্ছেন। ভালোবাসা এবং শাসনের এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ সম্পর্কের চাবিকাঠি।

কেন এই বন্ধুত্ব এখন জরুরি

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের চারপাশের জগৎ অনেক বেশি উন্মুক্ত। কিশোর-কিশোরীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশাল এক জগতের সঙ্গে যুক্ত,

 যেখানে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। যদি ঘরের ভেতর মায়ের সঙ্গে সন্তানের মন খুলে কথা বলার সুযোগ না থাকে, তবে সন্তান বাইরের মানুষের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা অনেক সময় তাদের ভুল পথে চালিত করে।

একজন মা যখন বন্ধুর মতো সন্তানের পাশে দাঁড়ান, তখন সন্তান তার একাকিত্ব অনুভব করে না। মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতার মতো বিষয়গুলো তখন অঙ্কুরেই বিনাশ করা সম্ভব হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মা তাদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন, সেসব সন্তান সামাজিকভাবে অনেক বেশি দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হয়।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ও মা 

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা সবাই সময়ের অভাবে ভুগছি। মায়েরা কর্মক্ষেত্রে বা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকছেন, আর সন্তানরা ডুবে থাকছে স্মার্টফোনে। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে আনতে দিনে অন্তত ৩০ মিনিট ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা ফোন সরিয়ে রেখে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। একসঙ্গে গল্প করা, সিনেমা দেখা কিংবা রান্না করার মতো ছোট ছোট কাজগুলো মা ও সন্তানের মধ্যকার দেয়াল ভেঙে ফেলে। 

সন্তানকে তার শখ বা ভালো লাগার বিষয়ে উৎসাহ দিন। সে যদি ছবি আঁকতে ভালোবাসে বা খেলাধুলায় আগ্রহী হয়, তবে সেখানে তার সঙ্গী হোন। মনে রাখবেন, শৈশবের এই স্মৃতিগুলোই তাকে ভবিষ্যতে একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। মা এবং সন্তানের এই অমূল্য সম্পর্কের মাঝে কোনো জড়তা থাকা উচিত নয়। 

মা হবেন সেই শীতল ছায়া, যার কাছে গেলে সব ক্লান্তি মুছে যায় এবং সেই সাহসী কণ্ঠস্বর, যা সন্তানকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। শাসনের কড়াকড়ি কমিয়ে যদি আস্থার হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে প্রতিটি ঘর হয়ে উঠবে স্বর্গ। সন্তানকে শাসন নয় বরং তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। পৃথিবীর সব সম্পর্ক ঠুনকো হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মা ও সন্তানের বন্ধুত্বের বন্ধন যদি দৃঢ় হয়, তবে কোনো ঝড়ই সেই সম্পর্কের ভিত নাড়াতে পারবে না। 

/এসএকে


  বিষয়:   ভালোবাসা  মা  সন্তান  বন্ধুত্ব  ইয়াশ রোহান 


Loading...
Loading...
আনন্দ সময়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: