মা শব্দটি ছোট কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক বিশাল জগৎ। দায়িত্ব, ভালোবাসা, ত্যাগ আর অদম্য শক্তির এক অনন্য মিশ্রণ। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মাকে ঘিরে উদযাপিত হয় ‘মা দিবস’।
এবছর দিনটি পড়েছে আগামী ১০ মে। মা দিবস ঘিরে আমরা যখন নানা গল্প শুনি, তখন বিশেষভাবে চোখে পড়ে সেই সব মায়েদের জীবন, যারা একসঙ্গে পেশা ও পরিবার সামলান। তেমনই একজন দেশের জনপ্রিয় মুখ উপস্থাপিকা, মডেল ও অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা। যিনি ক্যামেরার সামনে যতটা আত্মবিশ্বাসী, ঘরের ভেতর ততটাই নিবেদিত একজন মা।
নাবিলার মেয়ে স্মিহার বয়স এখন সাড়ে চার বছর। মাতৃত্বের পর জীবনের গতি বদলে গিয়েছিল তারও। ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়টায় হঠাৎ করেই আসে বিরতি। তবে সেই বিরতি ছিল না থেমে যাওয়ার বরং নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার। সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, অসুস্থতা কিংবা ছোট ছোট অভিমান সবকিছুর সঙ্গী ছিলেন তিনি। সেই সময়টাকে নাবিলা দেখেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায় হিসেবে।
বেশ কিছু দিন বিরতির পর আবারও কাজে ফিরেছেন তিনি। এখন নিয়মিত শুটিং, বিভিন্ন প্রজেক্ট- সব মিলিয়ে সময় যেন দৌড়ের ওপর। তার মতে, সাত দিনে সাত দিন, চব্বিশ ঘণ্টাই কাজের মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও একটুও কমেনি তার মায়ের ভূমিকা।
নাবিলা বলেন, আমার মেয়ে এখন বড় হচ্ছে, অনেক কিছু বুঝতে শিখছে। আমাকে খুঁজে, আমার সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। এই জায়গাটা আমি কখনোই অবহেলা করি না। তার কথায় স্পষ্ট- কাজের চাপ যতই থাকুক, সন্তানের প্রতি দায়িত্বে তিনি আপসহীন।
এখন তার জীবনের উৎসবগুলোর রংও বদলে গেছে। আগে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরি কিংবা নিজস্ব সময়ের আলাদা একটি জায়গা ছিল, সেখানে এখন সবকিছু ঘুরে দাঁড়িয়েছে মেয়েকে ঘিরে। ঈদ, জন্মদিন কিংবা যেকোনো বিশেষ দিন- সব আয়োজনে স্মিহাই তার কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা বাইরে ঘুরতে যাওয়া হয় না। যতটুকু সময় পাই, সবটাই মেয়ের জন্য রাখতে চাই। ওকে নিয়েই ঘুরতে যাই। এই পরিবর্তনটা তিনি কোনো ত্যাগ হিসেবে
দেখেন না বরং এটিকে জীবনের স্বাভাবিক রূপান্তর বলেই মনে করেন। তার কাছে এখন আনন্দের সংজ্ঞাই বদলে গেছে- মেয়ের হাসি, তার ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া পূরণ করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সুখ।
একই সঙ্গে নাবিলার সবচেয়ে বড় চাওয়া, তার মেয়ে যেন একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে বড় হয়ে উঠতে পারে। তিনি চান, স্মিহা এমন এক পরিবেশ বড় হবে যেখানে ভয় বা চাপ নয়, বরং ভালোবাসা, যত্ন আর ইতিবাচকতা তাকে ঘিরে রাখবে। ‘আমি চাই, আমার মেয়ে হাসিখুশিভাবে বড় হোক। যেন সে নিজের মতো করে ভাবতে পারে, নিজের কথা বলতে পারে,’ এমনটাই তার প্রত্যাশা।
আজকের সময়ের অনেক কর্মজীবী মায়ের মতোই নাবিলাও প্রতিদিন এক অদৃশ্য ভারসাম্যের খেলা খেলেন। একদিকে ক্যামেরার সামনে পেশাদারিত্ব, অন্যদিকে সন্তানের জন্য নির্ভরতার জায়গা হয়ে থাকা। কখনো ভোরবেলা শুটিংয়ে বের হওয়া, কখনো গভীর রাতে বাসায় ফেরা- এই সময়গুলোতে মনের ভেতর একটা টান থেকেই যায়। সেই টানই তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মা’।
নাবিলার মতে, একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘গিল্ট’ বা অপরাধবোধ সামলানো। অনেক সময়ই মনে হয়, হয়তো সন্তানের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, সময়ের পরিমাণ নয়, গুণগত মানটাই আসল। তিনি বলেন, আমি যখনই ওর সঙ্গে থাকি, পুরোটা সময় ওর জন্যই রাখি। ফোন, কাজ- সবকিছু পাশে সরিয়ে দিই।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কারণ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা অনেকেই কাছের মানুষদের সময় দিতে ভুলে যাই। অথচ শিশুরা চায় খুব সামান্য- তাদের কাছে মায়ের উপস্থিতি, একটু মনোযোগ আর ভালোবাসাই যথেষ্ট।
মা দিবসের এই বিশেষ সময়ে নাবিলার গল্প যেন অসংখ্য মায়ের প্রতিচ্ছবি। যারা বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত থেকেও ভুলে যান না মায়ের দায়িত্ব। নিজেকে ভেঙে গড়ে তোলেন, সন্তানের হাসির জন্য নিজের ক্লান্তি ভুলে যান। বাইরে থেকে তাদের জীবন যতই ঝলমলে মনে হোক, ভেতরে রয়েছে স্নেহ, ভালোবাসা ও ত্যাগের গল্প।
নাবিলা মনে করেন, পরিবার ও কর্মক্ষেত্র- দুটো জায়গার সমর্থন একজন মায়ের জন্য খুবই জরুরি। একজন মা একা সবকিছু সামলাতে পারে না। পরিবার যদি পাশে থাকে, তা হলে পথটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, তার মা তাকে এই ব্যাপারে অনেক সাহায্য করে। তিনি যখন শুটে যায় তার মা সময় দেয়। মা আছে বলেই কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকা যায়।
এই মা দিবসে, এমন সব মায়ের গল্পই আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। মায়ের ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা পরিসরে আটকে থাকে না। এটি প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের। নাবিলার মতো মায়েরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন- স্বপ্ন আর দায়িত্ব একসঙ্গে বয়ে নেওয়া সম্ভব, যদি থাকে ইচ্ছা আর ভালোবাসা।
শেষ পর্যন্ত, সব পরিচয়ের ওপরে যে পরিচয়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে, সেটি হলো ‘মা’। আর সেই পরিচয়েই নাবিলা আজ সবচেয়ে গর্বিত।
/এসএকে