চিঠি ও পার্সেল আদান প্রদানে এক সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘর এখন জনবল সংকটের কারণে ডাকসেবা কার্যক্রমে ঝিমিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চিঠি ও পার্সেল বিতরণে ধীরগতি দেখা দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
অথচ সরকারি এ ডাকঘর একসময় যোগাযোগ ও পার্সেল আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। তবে বর্তমানে সেবা কার্যক্রমে ধীরগতি, অনিয়মিত সেবা, জনবল সংকট এবং প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার কারণে অনেকেই এখন ডাকঘরের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে জরুরি বা মূল্যবান পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বিলম্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারী কুরিয়ার সার্ভিসগুলো দ্রুত ডেলিভারি, অনলাইন ট্র্যাকিং, হোম পিকআপ ও গ্রাহকসেবা উন্নত করায় মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সময়ের মূল্য বিবেচনায় মানুষ এখন একটু বেশি খরচ করেও নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত সেবা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘরে ১৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও রয়েছে ৮ জন। এর মধ্যে পোস্টমাস্টার ১ জন, পোস্টাল অপারেটর ৫ জন, পেকার ১ জন ও এমএলএসএস রয়েছে ১ জন। এছাড়া বাকী ১০ টি পদেই রয়েছে শুণ্য ।
আরও জানা গেছে, রাজবাড়ীর প্রধান-এ ডাকঘরে পেকার ৩ জন থাকার কথা থাকলেও ২ জন নেই, ডাকপিয়ন বা পোস্টম্যান পদে ৬ জনের একজনও নেই, রানার পদে ১ জন ও ঝাড়ুদার পদে ১ জন নেই।
ডাকঘরটিতে পোস্টম্যানের ৬টি অনুমোদিত পদ থাকলেও বর্তমানে সবকটিই শূন্য রয়েছে।
গত ২০ মার্চ ২০২৬ থেকে কোনো পোস্টম্যান কর্মরত নেই, কারণ পূর্বে দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা পর্যায়ক্রমে অবসরে গেছেন। ফলে প্রতিদিন আগত প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি চিঠি ও পার্সেল সময়মতো বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থায় ডাকঘর কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে ২ জন এমএলএসএস কর্মচারী দিয়ে সীমিত আকারে চিঠি বিতরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও চিঠি বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে এতে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না। শুধু রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘর না, জেলার সবকটি ডাকঘরেই জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে ডাক সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি কাগজপত্র সময়মতো না পাওয়ায় সেবা গ্রহণেও বিঘ্ন ঘটছে। এতে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস দিয়ে দ্রুত চিঠিপত্র ও পার্সেল আদান প্রদানে মানুষের আস্থা বাড়ছে। রাজবাড়ীতে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ চিঠি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে। আবার রাজবাড়ী থেকেও একই পরিমাণ চিঠি ও ডকুমেন্ট দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়।
এছাড়াও রাজবাড়ী থেকে এসএ পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিস, কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিস, জননী কুরিয়ার সার্ভিস, এজেআর কুরিয়ার সার্ভিস, ইউএসবি কুরিয়ার সার্ভিস ও পাঠাও কুরিয়ার সার্ভিস দিয়ে গ্রাহকরা চিঠি ও ডকুমেন্ট আদান প্রদান করে থাকে।
ডাকঘর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদে নিয়োগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে সচেতন মহলের দাবি, ডাকসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র জানান, প্রধান এই ডাকঘরে ১৮ টি জনবলের বিপরীতে রয়েছে ৮ জন। এই ৮ জন ১৮ জনের কাজ করছে। গত মার্চ মাসের ২০ তারিখ থেকে রাজবাড়ীর প্রধান ডাকঘরে কোনো পোস্টম্যান নেই। পোস্টম্যানের ৬ টি পদের মধ্যে সবকটি পদই এখন শূন্য রয়েছে। যারা পোস্টম্যান হিসেবে ছিলেন তারা সবাই পর্যায়ক্রমে অবসরে গিয়েছেন। নতুন করে কোনো পোস্টম্যান নিয়োগ দেননি সরকার।
তিনি জানান, পোস্টম্যান হচ্ছে ডাকঘরের প্রাণ। ডাকঘরের মূল কাজ চিঠিপত্র আদান-প্রদান। পোস্টম্যান না থাকায় চিঠিপত্র ও পার্সেল বিলিতে বিলম্ব হচ্ছে। রাষ্ট্রের স্বার্থে অফিসের দুজন এমএলএসএস দিয়ে চিঠি গুলো আপাতত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন প্রধান ডাকঘরে গড়ে ৩০০ চিঠি আসে। এছাড়াও গড়ে ৩০০ চিঠিপত্র পার্সেল, রেজিস্ট্রি, জিইপি হয়ে থাকে। কাজের স্বার্থে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এই চিঠি গুলো এখন বিলি করা হয়। শূন্য পদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। চিঠি দ্রুত বিলি নিশ্চিত করতে এবং জনবল সংকট দূর করতে নতুন পোস্টম্যান নিয়োগের দাবি রাজবাড়ীর সচেতন নাগরিকদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সেবা চালু এবং জনবল বৃদ্ধি ছাড়া এই আস্থা সংকট কাটানো কঠিন। অন্যথায় ভবিষ্যতে ডাকঘরের ভূমিকা আরও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
/এসএকে