পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অন্তত চারজন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।
রাতভর তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়। ২৪ ঘণ্টায় কলকাতায় দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেলঘাটায় তৃণমূলের পোলিং এজেন্ট বিশ্বজিৎ পাটনায়েক (৪৫) নিহত হয়েছেন। একটি ফোনকল পেয়ে তিনি ঘর থেকে বের হওয়ার পর নিজের বাড়ির দরজায় তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর দ্য স্টেটম্যান, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং হিন্দুস্তান টাইমসের।
পুলিশের ধারণা, তাকে ধাওয়া করা হয়েছিল এবং পালানোর সময় ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। তবে বিশ্বজিতের পরিবারের দাবি, তাকে ঘর থেকে টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের এক আত্মীয় বলেন, তারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে নিষ্ঠুরভাবে মারধর করেছে। ভয়ে প্রতিবেশীরাও এগিয়ে আসার সাহস পায়নি।
এই ঘটনায় ইতোমধ্যে একটি হত্যা মামলা করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বিজেপি এই ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পালানোর সময় তিনি একটি পানির ট্যাপের ওপর পড়ে যান। ট্যাপটি ভেঙে যাওয়ায় পানির তোড়ে তার শরীরের রক্ত ধুয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই ঘটনাস্থলে পরিবার কোনো রক্ত দেখতে পায়নি, যদিও তার নাক ও কান দিয়ে রক্ত ঝরছিল। বর্তমানে ওই এলাকাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডে তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় দখল বা ভাঙচুর এবং সেখানে বিজেপির পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কলেজ স্ট্রিটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পোস্টার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো এই ঘটনার জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে পরিস্থিতি বর্তমানে ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে এবং অনলাইনে কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক করেছে।
রাজধানী কলকাতার বাইরেও সহিংসতার মাত্রা ছিল ব্যাপক। শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে উদয়নারায়ণপুরে যাদব বার (৪৫) নামে এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ এই ঘটনায় এ চারজনকে গ্রেফতার করেছে এবং এটি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড তা খতিয়ে দেখছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে কলকাতা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নানুরে আবীর শেখ (৪৫) নামে এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনার জন্য বিজেপি সমর্থকদের দায়ী করেছে। তবে বিজেপি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ বলে দাবি করেছে। এ ছাড়া জলপাইগুড়িতেও নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি জানিয়েছেন, কোনো সহিংসতায় দলের কর্মীরা জড়িত থাকলে তাদের বহিষ্কার করা হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তৃণমূলের একটি অংশ বিজেপির পতাকা ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় সদ্য দলবদল করা ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি এবং প্রশাসনকে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে বিজেপির বিজয় মিছিল থেকে বুলডোজার দিয়ে একটি মাংসের দোকান ভাঙার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের অনুমতি নিয়েই মিছিলটি বের করা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) উপস্থিতিতে দোকানটি ভাঙা হয়।
ডেরেক তার পোস্টে লেখেন, মধ্য কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষেই মাংসের দোকান ভাঙতে বুলডোজার আনা হয়েছে। জয়ের উদযাপন হিসেবেই তা করা হয়েছে। সিএপিএফ কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। আপনাদের জন্য বিজেপি। সারা দুনিয়া দেখুক এই ছবি।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তারা জানায়, বিজয় মিছিলের অনুমতি দেওয়া হলেও সেখানে বুলডোজার নেওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনি প্রচারের সময় তৃণমূল অভিযোগ করেছিল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করবে। বিজেপি সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা প্রচার চালায়। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, মাছ-মাংস ছাড়া বাঙালি থাকতে পারবে না। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি