স্বাস্থ্যসেবা যেখানে সোনার হরিণ

মেহেরাব হোসেন শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি

সারাদেশ

কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে এখনও বঞ্চিত চরের মানুষ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত সেই বাস্তবতারই একটি

2026-05-07T07:55:50+00:00
2026-05-07T07:55:50+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
স্বাস্থ্যসেবা যেখানে সোনার হরিণ
মেহেরাব হোসেন শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৭:৫৫ এএম 
মাদারীপুর শিবচর উপজেলা। ছবি : সময়ের আলো
কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে এখনও বঞ্চিত চরের মানুষ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রসববেদনা শুরু হলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীকে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে নিতে হয় সদর হাসপাতালে। এ যাত্রা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, সময়সাপেক্ষও। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। শুধু প্রসূতি নয়, সাধারণ অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রেও একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীপথই চরের মানুষের একমাত্র ভরসা। খেয়া নৌকা ছাড়া অন্য কোনও নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ বাসিন্দা কৃষি ও মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত হলেও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবার অভাব তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সামান্য রোগের চিকিৎসার জন্যও কোনও সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় অনেকেই ঝাড়ফুঁক বা হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। গুরুতর রোগী হলে ভরসা শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তবে সেখানে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে পদ্মায় জেগে ওঠে চরজানাজাত। পরের বছর থেকে শুরু হয় বসতি। চর থেকে মূল ভূখণ্ডে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর স্রোত এবং নৌযানের সংকট- সব মিলিয়ে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নেই কোনও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন গর্ভবতী নারীরা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসা-কোনোটিরই ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করেন। এতে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপ থাকলেও কার্যকর কোনও চিকিৎসাসেবা নেই।

চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, এখানে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র- কিছুই নেই। গত মাসে প্রসববেদনা উঠলেও রাতে নৌকা না পেয়ে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি জানান, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে বড় বিপদ হতে পারত। দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তিনি বলেন, হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনও উপায় নেই। নদী পার হতে সময় লাগায় অনেক সময় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। অতীতে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ করেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

দুই সন্তানের জননী তাসলিমা সালমা বিবি বলেন, চিকিৎসা, বাজার ও শিক্ষা- সবকিছুর জন্যই চরের মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়। সন্তানের অসুস্থতায় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় স্থানীয় কবিরাজের ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্থানীয় নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত তারা। আধুনিক সুবিধা সংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের দাবি জানান তিনি, যেখানে সব বয়সের মানুষ চিকিৎসা পাবে।

ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, চরে এখনো কোনও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছেনি। গুরুতর রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান জানান, জনবল সংকট ও দুর্গম অবস্থানের কারণে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে উপ-সহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

এএডি/


  বিষয়:   স্বাস্থ্যসেবা  সোনা  হরিণ  শিবচর  মাদারীপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: