মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার প্রভাব এশিয়ার জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট তৈরি করেছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশের সরকার জ্বালানি সহায়তার জন্য চীনের দ্বারস্থ হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন এখন তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিপুল জ্বালানি মজুত গড়ে তুলেছে এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা বাড়িয়েছে। বেইজিং একদিকে জ্বালানি ঘাটতি পূরণের প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশগুলোকে ক্লিন এনার্জি বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার পর চীন কিছু জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি সীমিত করে। এর ফলে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যারা জেট ফুয়েল, পেট্রল ও ডিজেলের জন্য চীনা শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল তারা তীব্র সংকটে পড়ে।
বর্তমানে ভিয়েতনাম জেট ফুয়েল সংকট মোকাবিলায় বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে। ফিলিপাইন সার রপ্তানি সীমিত না করার অনুরোধ জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে বেইজিং সফরে গিয়ে চীনা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে জেট ফুয়েল সরবরাহের বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে চীন আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় কিছু সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ জোরদার এবং ভবিষ্যতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চীনের এই কৌশলগত সহায়তার ফলে কিছু মাত্রায় জ্বালানি সরবরাহ বজায় থাকলেও এশিয়াকে সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে আংশিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেইজিং ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে।
চীনের অবস্থান বিষয়ে বলা হচ্ছে, বেইজিং জানিয়েছে এই যুদ্ধ তারা শুরু করেনি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হোক সেটিও চায় না, তবে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে তাদের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমাধান রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর নীতিতে জোর দিচ্ছেন, তখন চীন নিজেকে ভবিষ্যতের ক্লিন এনার্জি-নির্ভর অর্থনীতির নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের চীন বিষয়ক জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান মিশাল মেইদান বলেন, চীন অত্যন্ত সতর্কভাবে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, বেইজিং এই সহযোগিতাকে সফট পাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের গ্রিন টেকনোলজি বাজার গড়ে তুলছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীন বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তবে বর্তমান সংকটের ফলে বেইজিং ঋণনির্ভর সমালোচনা এড়িয়ে জ্বালানি ও ক্লিন এনার্জি সহযোগিতাকে নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীন বিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং বলেন, চীনা নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারছেন যে ক্লিন এনার্জি তাদের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধের মধ্যেও চীন থেকে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। মার্চে ভিয়েতনামে জেট ফুয়েল রপ্তানি ৩৪ শতাংশ বেড়েছে, ফিলিপাইনে সার রপ্তানি ৩৩ শতাংশ এবং ডিজেল রপ্তানি ১৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ অঞ্চলটি এখনো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট চীনকে আঞ্চলিক জ্বালানি ও ক্লিন টেকনোলজির কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
আরবিএন