চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স ও মিডওয়াইফদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডেলিভারি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের মাতৃসেবা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কমিশনের বিনিময়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার করার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।
এদিকে অনিয়মের খবর পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই হাসপাতাল পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম। দুপুরে তিনি সরেজমিন হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন।
এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও অব্যবস্থাপনা তার নজরে আসে। তিনি রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তার কাছে চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন একাধিক রোগী। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এমপি এনামুল হক এনাম বলেন, পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। নার্স সিন্ডিকেট, দালাল চক্র এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানা অনিয়মের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমপি এনামুল হক এনাম আরও বলেন, সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেখানে রোগীদের হয়রানি কিংবা প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে বাধ্য করার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগগুলো তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন এনামুল হক এনাম এমপি। তিনি ইতিমধ্যে সংসদে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০০ শয্যায় রূপান্তরের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করে দীর্ঘদিনের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। তার কথায়, পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়মের সঙ্গে জড়ালেই কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
জানা গেছে, এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে। একটি দল ডেলিভারি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার এবং নার্স সিন্ডিকেটের অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। আর অন্য দল হাসপাতালের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, দালাল চক্রের তৎপরতা এবং সেবার মান পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তদন্ত টিম ইতিমধ্যে বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিচ্ছে।
এদিকে জানা গেছে, সুপারভাইজার পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোট অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ‘না ভোট’ জয়যুক্ত হয় এবং সুপারভাইজার পদটি প্রয়োজন নেই বলে মতামত আসে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এরপরও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু তৈয়ব ক্ষমতার অপব্যবহার করে সুপারভাইজার পদে নিয়োগ দেন যা তার এখতিয়ারবহির্ভূত বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু তৈয়বের কাছে জানতে চাইলে তিনি নার্সদের অনিয়মের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, একটি সিন্ডিকেটের কারণে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। ডেলিভারি রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার করার বিষয়টি অবগত আছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই হাসপাতালে থাকার কারণে নার্সদের মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে ডেলিভারি বাড়ানোর জন্য একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে সুপারভাইজারের বিষয়ে তিনি বলেন, সবার সম্মতিক্রমে সুপারভাইজার নিয়োগ দিয়েছি।
এ প্রসঙ্গে ডিজিএনএম কর্তৃক নিয়োগকৃত জেলা সুপারভাইজার (পাবলিক হেলথ নার্স) নাসরিন আক্তার জানান, অভিযোগের বিষয়ে জেনে জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার খানকে বিষয়টি অবহিত করার পর তিনি পটিয়া স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে বলেন, সুপারভাইজার নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার এখতিয়ার নেই। এ ছাড়া তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সদের অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সুপারভাইজার নিয়োগ ও নার্সদের অনিয়মের বিষয়ে জানতে একাধিকবার জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার খানকে ফোন ও টেক্সট দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ কিংবা টেক্সটের উত্তর দেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের বিধিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি নার্স বা মিডওয়াইফ স্বতন্ত্রভাবে প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন না এবং ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনার অনুমোদন নেই। বিধিমালা অনুযায়ী শুধু বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন। নার্স বা মিডওয়াইফ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করতে পারেন। রোগ নির্ণয় করে নিজ উদ্যোগে চিকিৎসা দেওয়া আইনবহির্ভূত এবং ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা পেশাগত আচরণবিধির পরিপন্থী।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসব অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নার্স বা মিডওয়াইফদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস, বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত, চাকরি থেকে অপসারণ, নার্সিং নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, সিনিয়র স্টাফ নার্স অর্পিতা দত্ত, নূর নাহার বেগম, ফুলকিতা দত্ত এবং মিডওয়াইফ আফরিন, শরিফা জেসমিন ও রূমা নন্দীসহ আরও কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ডেলিভারি সেবা কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
রোগী নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, অর্পিতা দত্ত, নূর নাহার বেগম ও পুলকিতা দত্ত পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করেন এবং অন্যদের মাধ্যমে রোগীদের নিয়ন্ত্রণে নেন। হাসপাতালে আসা গর্ভবতী রোগীদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ফি নিয়ে চেকআপ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গর্ভাবস্থায় সীমিত কয়েকটি চেকআপ করানো হলেও বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়। এসব পরীক্ষা থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তীতে ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে এলে রোগীদের নানা অজুহাতে পার্শ্ববর্তী প্রাইভেট ক্লিনিকে রেফার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কর্ণফুলী ভবনের নিচ তলায় অর্পিতা দত্ত এবং খাজা টাওয়ারের তৃতীয় তলায় নূর নাহার বেগম পৃথকভাবে রোগী দেখতেন এবং হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তাদের মধ্যে কয়েকজনের বেনামে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে শেয়ার থাকার বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্যও উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি ২৬ বছর বয়সি আঁখি আক্তার নামের এক ডেলিভারি রোগীকে নূর নাহার বেগম প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠান। সেখানে তাকে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়।
এর আগে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন চেকআপের নামে তাকে আরও কয়েকটি পরীক্ষা করানো হয়েছিল। এ ছাড়া ২৫ মার্চ ২০ বছর বয়সি তাসমিন আক্তার নামের আরেক রোগীকেও একইভাবে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানেও তাকে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় বলে জানা গেছে। একই মাসের ১২ তারিখ ১৯ বছর বয়সের সামিয়া আক্তার হাসপাতালে গেলে নার্স রুমা নন্দী তাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি ল্যাব থেকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য পাঠান।
চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ২৪ বছর বয়সি রুপনা দাশ নামে আরেকজন রোগীকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠান অর্পিতা দত্ত। আরও একটি ঘটনায় জানা যায়, গত ২ এপ্রিল আমেনা নামের এক রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি বেসরকারি ল্যাবে পাঠানো হয়।
ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ২০২২ সালে একজন রোগীকে জোরপূর্বক প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানোর ঘটনায় সিনিয়র স্টাফ নার্স নূর নাহার বেগমের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তৎকালীন সংসদ সদস্যের সুপারিশে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারে অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার তিমির বরণ চৌধুরী ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্সকে ওটি কক্ষ থেকে বের করে দেন বলেও জানা গেছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও মিলছে অসঙ্গতি : হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ডেলিভারি চেকআপের জন্য আসেন ৪২৮ জন রোগী। এর মধ্যে ভর্তি হন ৫১ জন এবং ডেলিভারি হয় ৩২ জনের যার মধ্যে ৩টি সিজারিয়ান। ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৩৭ জন রোগী চেকআপে আসেন। এ সময় ৩৩টি নরমাল ডেলিভারি এবং ৩টি সিজারিয়ান সম্পন্ন হয়। বাকি রোগীদের একটি বড় অংশকে প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মার্চ মাসে ডেলিভারি রোগী চেকআপের জন্য আসেন ৩৯৯ জন। এর মধ্যে নরমাল ডেলিভারি হয় ৩২ জন এবং সিজার হয় দুজনের। অথচ সরকারিভাবে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডেলিভারি ও সিজারের সুব্যবস্থা রয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি