সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিয়ে বেড়েই চলেছে ভয়ংকর মাদক ইয়াবার ব্যবহার ও পাচার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাগাম টানার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। কারণ পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে। বর্তমানে ইয়াবা পাচারের তালিকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও আলোচিত কৌশল হয়ে উঠেছে বডি প্যাকিং।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের বিশেষ অভিযানে ১৯ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ চার রোহিঙ্গা মাদক কারবারি আটক হওয়ার ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে ভয়ংকর এই পাচার কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটি এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ইয়াবা বা অন্য মাদকদ্রব্য ছোট ছোট পলিথিনে মুড়িয়ে মানবদেহের ভেতরে বহন করা হয়। কখনো মুখ দিয়ে গিলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে জমা রাখা হয়। আবার কখনো শরীরের গোপন অঙ্গে লুকিয়ে পরিবহন করা হয়।
এরপর গন্তব্যে পৌঁছে তা বের করে সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় র্যাবের সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া চারজন রোহিঙ্গাও ঠিক একই কৌশল ব্যবহার করেছিল। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী একটি যাত্রীবাহী বাসে তারা নিজেদের সাধারণ যাত্রীর মতো ছদ্মবেশ ধারণ করে। কিন্তু গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে র্যাব সদস্যরা সন্দেহভাজন চারজনকে শনাক্ত করে।
পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে, তাদের পেটের ভেতরে ইয়াবার পুটলি রয়েছে। এরপর সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এক্স-রে ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের শরীর থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা।
আন্তর্জাতিকভাবে বডি প্যাকিং শব্দটি বহু পুরোনো। লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কোকেন পাচারের সময় প্রথম এই কৌশল ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়াতেও এটি উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। এই পদ্ধতিতে মাদকদ্রব্যকে খুব ছোট আকারে বিশেষভাবে মোড়ানো হয়।
সাধারণত পলিথিন, রাবার, কনডম বা বিশেষ টেপ ব্যবহার করে একাধিক স্তরে প্যাকেট তৈরি করা হয়, যাতে তা পাকস্থলীর অ্যাসিডে নষ্ট হয়ে না যায়। এরপর পাচারকারী সেগুলো মুখ দিয়ে গিলে ফেলে। একজন পাচারকারী কখনো কখনো শতাধিক প্যাকেটও বহন করে থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি প্যাকেট ফেটে গেলেই অতিরিক্ত মাদক শরীরে ছড়িয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে ইয়াবার মতো মেথামফেটামিনভিত্তিক মাদক শরীরে দ্রুত বিষক্রিয়া তৈরি করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চেকপোস্ট, স্ক্যানার ও সাধারণ তল্লাশি এড়িয়ে যাওয়া। যেহেতু মাদক শরীরের ভেতরে থাকে, তাই অনেক সময় সন্দেহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পাচারকারীরা যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন বা লঞ্চ ব্যবহার করে সহজে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মাদক সরিয়ে নেয়।
র্যাব জানায়, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ইয়াবা সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। তারা যাত্রীবাহী বাসে সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে চলাচল করত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শরীরের ভেতরে ইয়াবা বহনের কৌশল ব্যবহার করত।
এ বিষয়ে র্যাব-১৫ এর স্কোয়াড্রন লিডার মোহাম্মদ মেহেদী আলম বলেন, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে ইয়াবা পাচার করে আসছিল। তারা কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালান পৌঁছে দিত। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পাচারকারীরা এখন মানবদেহ ব্যবহার করছে।
তবে গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে এ ধরনের চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেকোনো উপায়ে মাদক ব্যসায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
র্যাববলছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে ইয়াবা পাচার করছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধীচক্র সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ইয়াবা দেশে প্রবেশ করাচ্ছে। পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস। মানবিক সংকটের কারণে সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও মানব পাচার চক্র।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মাদকচক্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সীমান্তের নিকটবর্তী অবস্থান, ঘনবসতিপূর্ণ ও জটিল ক্যাম্প কাঠামো, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা এবং সহজে পরিচয় গোপন করার সুযোগ।
মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা উৎপাদন ও পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশের পর বিভিন্ন দালাল ও পরিবহনকারীর মাধ্যমে তা দেশের ভেতরে পৌঁছে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষকে অল্প টাকার বিনিময়ে ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা পাচারের প্রধান রুট হচ্ছে টেকনাফ-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এরপর সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান ভাগ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম হয়ে কিছু চালান যায় ঢাকায়। কিছু যায় কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলে। আবার একটি অংশ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতেও পৌঁছে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ার কারণে ইদানীং শরীরের ভেতরে মাদক বহনের প্রবণতা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মানবদেহে কোনো বস্তু দীর্ঘ সময় থাকলে অন্ত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া সংক্রমণ, আলসার, রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীরা কয়েক দিন না খেয়ে থাকে যাতে মলত্যাগ কম হয়। এতে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার প্যাকেট বের করতে তারা নানা ধরনের ওষুধ ব্যবহার করে যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
সময়ের আলো/জেডি