৩০ ফুট দূরেই আধুনিকতা, সেতুর অভাবে বিচ্ছিন্ন ১০ পরিবার
গোলাম কিবরিয়া খান, কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
৪০ বছর ধরে নিজেদের তৈরি বাঁশের সাঁকোতে চলছে ১০ টি পরিবারের দুর্ভোগের জীবন। ছবিটি কাজিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া থেকে তোলা। ছবি : সময়ের আলো
ছিমছাম পাকা সড়কের পশ্চিম পাশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন জনবসতি। আর সড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ৩০ ফুট চওড়া একটি খাল। খালের ওপারে চার দশক ধরে বসবাস করছেন ১০টির বেশি পরিবার। কিন্তু একটি সেতুর অভাবে আধুনিক সভ্যতা থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরেই যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে আছেন তারা।
শুকনো মৌসুমে মালামাল পরিবহনে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আর বর্ষা এলে খালে ১০ ফুটের বেশি পানি জমে প্রায় ছয় মাস। তখন চারপাশের পানি ঘিরে চরপাড়াটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ—সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো কিংবা পানি পেরিয়েই চলাচল করতে হয়।
এমন চিত্র দেখা গেছে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিয়ারা চরপাড়া গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। একাধিকবার লিখিত আবেদন করেও এখনো মেলেনি স্থায়ী সমাধান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর নিজেদের উদ্যোগে খালের ওপর বাঁশের সরু সাঁকো তৈরি করতে হয়। সেটি পারাপারের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োবৃদ্ধ সাঁকো থেকে পড়ে আহত হয়েছেন।
চরপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদের জানান, তার বাবা মৃত কুড়ান মণ্ডল প্রায় ৪০ বছর আগে খালের ওপারে বাড়ি করেন। পরবর্তীতে যমুনা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে এসে বসতি গড়ে তোলেন। বর্তমানে ছোট এই পাড়াটিতে ১০টির বেশি পরিবার বসবাস করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। পাশাপাশি আছেন শিশু, প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ও নারীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
কাদের আরও জানান, বর্ষার শুরু থেকে প্রায় ছয় মাস খালে ১০ ফুটের বেশি পানি থাকে। তখন চারদিক পানিতে ঘেরা থাকায় পুরো পাড়াটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতি বছর নিজেদের উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো তৈরি করলেও তা নিরাপদ নয়।
আরেক ভুক্তভোগী ফজলার রহমান বলেন, ‘আমার জীবন তো চলেই গেল। কিন্তু নাতি-নাতনিরা খুব দুর্ভোগে আছে। ওরা স্কুলে যায়। গরু-ছাগল কথা বলতে পারে না, পারলে বোঝা যেত দুর্ভোগ কতটা নির্মম।’
ভুক্তভোগী পিয়ারা খাতুনও বলেন একই কথা। তিনি জানান, চারপাশে পানি থাকায় তারা যেন দ্বীপে নির্বাসিত মানুষের মতো জীবনযাপন করছেন। আধুনিক সভ্যতা থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ঠিকভাবে পৌঁছায় না।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে কাজিপুর পৌরসভার মেয়রের কাছে একটি সেতুর জন্য একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছি। সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই পৌর প্রশাসকের কাছেও আবেদন করেছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হলেও একটি সেতু চাই।’
৪০ বছর ধরে নিজেদের তৈরি বাঁশের সাঁকোতে চলছে ১০ টি পরিবারের দুর্ভোগের জীবন। ছবিটি কাজিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া থেকে তোলা। ছবি : সময়ের আলো
আরেক বাসিন্দা জোৎস্না খাতুন বলেন, ‘রিলিফ চাই না, ব্রিজ চাই। হাত-পা ভালো আছে, খাইটা খাইতে পারি। এটা আমার প্রাণের দাবি।’
দুর্ভোগের আরেক দিক তুলে ধরে বিউটি খাতুন বলেন, ‘বাড়িঘর উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। বিয়ের উপযুক্ত ছেলে-মেয়ে ঘরে আছে। বাড়িতে লোকজন আনতে পারি না। এলেও রাস্তা-ঘাটের অবস্থা দেখে সম্বন্ধ আর এগোয় না।’
স্থানীয়রা জানান, কাজিপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ১ হাজার ৩০৩ মানুষের বসবাস। ওয়ার্ডটিতে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারটি মসজিদ রয়েছে। তবে পৌরসভার অন্য ওয়ার্ডের তুলনায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কম বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কাজিপুর পৌরসভায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম (লিটন) বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি অনুমোদন হতে পারে।
তবে চরপাড়ার সেতুর বিষয়ে কাজিপুর পৌরসভার নবনিযুক্ত প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।