বাংলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এপার-ওপার সারা বাংলাজুড়ে তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার অসংখ্য স্মৃতি। আমরা সেই রবীন্দ্রস্মৃতির খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম একদিন।
খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের রবীন্দ্র কমপ্লেক্স এবং রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামে পূর্বজদের বসতভিটা ও রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা তাঁর উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময় জায়গা।
একজন রবীন্দ্র অনুরাগী হিসেবে আমার স্বপ্ন ছিল, দেশের আনাচে কানাচে রবীন্দ্রনাথের যত স্মৃতিবিজড়িত জায়গা আছে, সব ঘুরে দেখবো। সেই ইচ্ছে থেকেই খুলনায় ছুটে যাওয়া। ঢাকা থেকে প্রথমে যাই গোপালগঞ্জে। সেখান থেকে একজন সফরসঙ্গীকে নিয়ে, পরদিন সকালে রওনা হই খুলনার উদ্দেশে। গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইন থেকে ঢাকা হতে আগত খুলনাগামী একটি বাসে উঠে পড়ি। ভাড়া নেয় ১২৫ টাকা।

রূপসা ব্রিজের ওপারে নেমে, একটি অটোতে উঠে ব্রিজের নিচ দিয়ে রূপসা ঘাটের দিকে এগিয়ে আসি। অটো বদলে আরেকটা অটোতে উঠে পড়ি, সরাসরি রূপসা ঘাটে যাওয়ার জন্য। অটো ভাড়া যথাক্রমে ১০ ও ২০ টাকা করে নেয়। ঘাটে এসে জনপ্রতি ২ টাকা করে ঘাট ভাড়া দিয়ে, নৌকায় উঠে পড়ি। নৌকায় মাত্র ৪ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে ওপারে নামিয়ে দেয়। নেমে, একটি ইঞ্জিনচালিত ভ্যান রিজার্ভ করি পিঠাভোগ কুশারী বাড়ির উদ্দেশে। যাওয়া-আসার ভাড়া ৩০০ টাকা।
ভ্যান চলতে শুরু করলো। চল্লিশ-পাঁচ চল্লিশ মিনিট পর পৌঁছে গেলাম ঘাটভোগ ইউনিয়নের সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায়। জায়গাটি খুবই সাদামাটা। প্রশাসন জায়গাটিকে সংরক্ষণ করেছে বটে, তবে তা সুন্দরভাবে সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রথমেই চোখে পড়লো বড় একটি লাল রঙের ফটক। যার গায়ে লেখা- ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ও রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা- রূপসা’। পাশেই একটি পোস্টারে জায়গাটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ লেখা। বিবরণ থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে দীননাথ কুশারীর অষ্টম পুরুষ তারানাথ কুশারী ভৈরব নদীর তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তারানাথ কুশারীর দুই পুত্র রামগোপাল ও রামনাথ। রামগোপাল কুশারীর পুত্র জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুর বংশের আদি পুরুষ।

ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে, প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ও কুশারী বংশ নিয়ে কিছু লেখা চোখে পড়লো। সাথে রবীন্দ্রনাথের একটি স্থির চিত্র। জানতে পারলাম, জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী পঞ্চম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী জাতি কলহের কারণে পিঠাভোগের যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ভ্রাতার অনুকূলে হস্তান্তর করে, ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী কলকাতা সুতানটীর দক্ষিণ দিকের গ্রাম গোবিন্দপুরে গিয়ে বসবাস করেন। কথিত আছে, সে সময় গোবিন্দপুরে বসবাস করতো জেলে, মালো, কৈবর্ত্য, পোদ, বণিক প্রভৃতি জাতি।
মজার ব্যাপার হলো, এই তথাকথিত এতগুলো জল অনাচরনীয় শুদ্রের মধ্যে পঞ্চানন কুশারীরা একঘর ব্রাহ্মণ ছিলেন। ফলে, এতদ্ অঞ্চলে লোকজন পঞ্চানন কুশারীকে ভক্তিভরে ‘ঠাকুর’ ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। কেবল তাই নয়, এ সময় ভাগীরথী নদীতে ইংরেজদের বাণিজ্য তরী ভিড়তো। সেই বাণিজ্য তরীর মাল ওঠানো-নামানোর ঠিকাদারি এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যাবসা শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী।
এ কাজে স্থানীয় লোকদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হতো। এই শ্রমিকরা তাকে ‘ঠাকুর’ বলে ডাকায়, জাহাজে কর্মরত কর্মচারী ও কাপ্তানদের কাছেও তিনি ‘ঠাকুর’ বলে পরিচিত হন। এইভাবে একদিন পঞ্চানন কুশারীর নাম ও উপাধি ‘ঠাকুর’ ডাকের অন্তরালে অস্তমিত হয়। এবং কাগজ কলমেও ‘ঠাকুর’ উপাধি জারি হয়ে যায়। কলকাতার গোবিন্দপুরের বাসিন্দা পঞ্চানন কুশারী ওরফে পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর নীলমনি ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাকোঁয় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। জোড়াসাকোঁর সেই বিখ্যাত ঠাকুর বংশে ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ, উজ্জ্বল নক্ষত্র , প্রথম বাঙালি নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!
পাশেই রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা। তিনটা কক্ষ সেখানে, তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিলো। আমরা বলার পর, একজন চাবি নিয়ে এসে খুলে দিলো। তিনটি কক্ষ আর বারান্দায় রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন সময়ের ছবি আছে। একটি বুকশেলফে আছে কিছু বই। খুব একটা সাজানো গোছানো আর যত্নে নেই সেসব। চারপাশে ধুলো পড়ে আছে। উঠোনের একপাশে একটি মঞ্চ। সেখানে রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য তৈরি করে রাখা হয়েছে। আশপাশে কুশারী বংশের মানুষের বসতবাড়ি রয়েছে। সব মিলিয়ে এটুকুই।

কুশারী বাড়ির প্রাঙ্গণে আমাদের আলাপ হলো অশীতিপর একজন বৃদ্ধার সঙ্গে। যার নাম, ছায়া রানি কুশারী। তিনি কুশারী বংশের আঠারোতম প্রজন্মের একজনের স্ত্রী। তার জন্ম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই। সেই যুগের শিক্ষিতা নারী তিনি। এত বয়স হওয়া সত্ত্বেও তার কথা বলায় এখনো আশ্চর্য এক দীপ্তি রয়েছে। কথা শুনেই বোঝা যায়, তিনি একজন অভিজাত বংশীয় বাড়ির বউ এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত। আমাদের তিনি অনেক বড় হওয়ার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আশীর্বাদ করলেন। নারীদের নিজের একটা আইডেন্টিটি থাকা যে কতটা জরুরি, তা বোঝালেন। রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটাও আবৃত্তি করে শোনালেন। শীতের নরম রোদে গল্প করতে করতে চলে আসার সময় ঘনিয়ে এলো। আসার সময় তিনি বললেন, ‘দিদিভাই, এ জীবনে বোধহয় আমাদের আর দেখা হবে না। অনেক তো বাঁচলাম, আমি আর কদিন আছি, বলো। পারলে, আবার এসো।’ এত মন খারাপ হলো তার কথায়। সত্যিই, হয়ত আর দেখা হবে না। কিন্তু, আমাদের মাথায় তার হাতের স্পর্শ, আশীর্বাদ, শীতের রোদমাখা উষ্ণ স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে।

পিঠাভোগ থেকে ফিরে আবার রূপসা ঘাট পার হয়ে, সিএনজিতে উঠে পড়লাম। ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিলো। ভাড়া নিলো জনপ্রতি ৬৫ টাকা। সেখান থেকে একটা অটো রিজার্ভ করলাম, দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে যাওয়ার জন্য। যাওয়া-আসা ৩০০ টাকা।
এই রবীন্দ্র কমপ্লেক্সটা মূলত মৃণালিনী দেবীর পৈতৃক ভিটে। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয়। ১২৯০ বঙ্গাব্দের ২৪ অগ্রহায়ণ, দাক্ষায়ণী দেবী ও বেণীমাধব রায় চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ভবতারিনী ওরফে ‘ফুলি’র সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার নাম বদলে রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। বাড়িটি প্রথমে দোচালা টিনের ঘর ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিয়ের পর, বাড়িটি ভেঙে দালান তৈরি করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাড়িটি পুনরুদ্ধার করার পর, জাতীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে এর নামকরণ করা হয় ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’।

১০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে সেখানে ঢুকলাম। সবুজ ঘাসের প্রাঙ্গণে শুভ্র এক দোতলা বাড়ি। বাড়িটির নিচ তলায় চারটি ও দোতলায় দুইটি কক্ষ রয়েছে। এছাড়া, দোতলায় দক্ষিণমুখী বারান্দা ও ছাদে চিলেকোঠাও রয়েছে। ছাদে ওঠা নিষেধ, তাই চিলেকোঠা দেখার সুযোগ হয়নি। বাড়িটিতে রবীন্দ্রনাথের বই, গীতাঞ্জলির কপি, স্মৃতি বিজড়িত অনেক ছবি, তাঁর নোবেল বক্তৃতা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এমনকি সেই সময়কালে উঠোনের একপাশে যেই বাথরুম ছিলো, তাও সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম সব। মনে হচ্ছিলো, যেন রবী বাবুর উপস্থিতির সুবাস আজও সেখানে রয়ে গেছে। উঠোনের যেখানটায় রবীন্দ্রনাথ একদিন বসেছিলেন, সেখানে পা রাখলাম। পাশেই একটি শিউলি ফুলের গাছ। শরীর, মন কেমন করে উঠলো। আহা, রবী বাবু, মৃত্যুর প্রায় শত বছর পরেও আপনি কী পরম মমতায় মানুষের অন্তরে বেঁচে আছেন। কী সার্থক জনম আপনার!

খেয়াল করলাম, বাড়িটির কিছু অংশ সংস্কার না করে, এখনো সেই পুরোনো ইটের গাঁথুনি রেখে দেওয়া হয়েছে। হয়ত তা স্মৃতিস্বরূপ রাখা হয়েছে। বাড়িটির সামনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড্ডয়মান দেখে মনে হলো, রবীন্দ্রনাথ বাংলাকে ভালোবেসে যেভাবে বুকের ভেতর আগলে রাখতেন, পতাকাটি যেন সেই ভালোবাসা জানান দিয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্র কমপ্লেক্সের সামনে একপাশে রবী ঠাকুর, অন্য পাশে মৃণালিনী দেবীর ভাস্কর্য তৈরি করে রাখা হয়েছে। জনমদুখী মৃণালিনী কী মৃত্যুর পরেও এভাবে তার জীবনসঙ্গীর পাশে আছেন? কে জানে।
প্রতিবছর এখানে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকীতে তিনদিন ব্যপী লোকজ মেলা হয়। একবার সেই মেলায় যাওয়ার ইচ্ছে পুষে রেখে, সবুজ ঘাস, ফুলের উঠোন, রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনী দেবীর স্মৃতি পেছনে ফেলে আমরা ফেরার পথ ধরলাম।
/মহু