হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। নতুন এই নিয়ম না মানলে জাহাজে হামলা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের বারবার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর নিজেদের আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে আসা একটি নথিতে দেখা গেছে, প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোর জন্য নতুন কিছু শর্ত দিয়েছে তেহরান।
‘ভেসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশন’ নামে এই নথিটি মূলত একটি আবেদনপত্র। ইরানের নবগঠিত ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ (পিজিএসএ) এটি প্রকাশ করেছে। নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে প্রতিটি জাহাজকে এই ফর্ম পূরণ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি সব দেশের জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হুমকি দিয়ে আসছে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করলে তার ওপর হামলা চালানো হবে।
এরই মধ্যে কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বেশিরভাগ জাহাজ মালিক ও অপারেটররা ঝুঁকি নিয়ে এই পথে জাহাজ পাঠাতে চাইছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করে ইরান বোঝাতে চাচ্ছে যে, তারা হরমুজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বুধবার চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি সাড়ে চার ডলার ছাড়িয়ে যায়।
‘নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থা’ গড়ার বার্তা
বুধবার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বার্তায় পারস্য উপসাগর নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, শক্তিশালী ইরানের কৌশলের অধীনে নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে বিদেশি শক্তির কোনো স্থান থাকবে না।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এর আগে এপ্রিলের শেষ দিকে খামেনির নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ইরান হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন আইনি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা চালু করবে।
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা বিদেশিদের এই প্রণালিতে কোনো জায়গা নেই। তাদের স্থান কেবল এর পানির নিচে।
নতুন ঘোষণাপত্রে কী তথ্য চাওয়া হয়েছে
পিজিএসএ-এর ঘোষণাপত্রে জাহাজ মালিকদের কাছে ৪০টির বেশি তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জাহাজের নাম ও পরিচিতি নম্বর, আগের নাম থাকলে সেটি, জাহাজের মূল দেশ ও গন্তব্য, নিবন্ধিত মালিক ও অপারেটরের তথ্য, ক্রুদের জাতীয়তা, জাহাজে থাকা পণ্য বা কার্গোর বিস্তারিত তথ্য।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার আগে এসব তথ্য ই-মেইলে পাঠাতে হবে।
সিএনএনের হাতে আসা পিজিএসএ-এর একটি ই-মেইলে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক। এতে আরও সতর্ক করে বলা হয়, ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে তার দায় পুরোপুরি আবেদনকারীর ওপর বর্তাবে এবং এর পরিণতিও তাদের বহন করতে হবে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো শিপিং কোম্পানি ইরানের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুমতি চেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এমন করলে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সিএনএন পিজিএসএ, হোয়াইট হাউস ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কিছু দেশ ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে
এর আগে ইরান জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত কোনো জাহাজকে তারা হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে দেবে না।
অন্য দেশগুলোর জাহাজও ইরানের অনুমতি নিয়েই চলাচল করতে পারবে বলে জানানো হয়।
ভারত ও পাকিস্তানের মতো কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে তাদের পতাকাবাহী জাহাজ নিরাপদে পার করার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
মেরিটাইম ডেটা অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান ‘লয়েডস ইন্টেলিজেন্স’-এর রিচার্ড মিড বলেন, ইরান আগে যেসব তথ্য চাইত, নতুন নিয়মেও মূলত একই তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তবে এবার সেটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, এর মাধ্যমে প্রণালিতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে ইরান।
টোল আদায়ের অভিযোগ
নতুন ঘোষণাপত্রে প্রণালি পার হওয়ার জন্য কোনো ফি দিতে হবে কি না, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
তবে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ইরান প্রতিটি জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায় করছে।
তেহরান এই প্রণালিকে সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে এই অর্থ ব্যবহার করা হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মার্কিন নাগরিক, প্রতিষ্ঠান বা মার্কিন মালিকানাধীন বিদেশি কোম্পানিগুলো ইরান সরকার বা আইআরজিসিকে এ ধরনের কোনো অর্থ দিতে পারবে না।
মেরিটাইম রিস্ক কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘ম্যারিস্কস’-এর প্রধান নির্বাহী দিমিত্রিস মানিয়াটিস বলেন, অনুমতি পাওয়ার পর জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট সমুদ্রপথ ধরে চলতে বলা হচ্ছে, যা ইরানের উপকূলের কাছাকাছি কাশম ও লারাক দ্বীপের মাঝ দিয়ে যায়।
উপসাগরে আটকা পড়েছেন হাজারো নাবিক
ইরান যখন প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তখন একই সঙ্গে ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধও চলছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগ ঘোষণা করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করা। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়।
বিশ্লেষক দিমিত্রিস মানিয়াটিসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইরানের আগ্রাসী অবস্থানকে আরও উসকে দিয়েছে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১ হাজার জাহাজ এবং অন্তত ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।
মানিয়াটিস বলেন, নাবিকেরা সেনাসদস্য নন। তারা সাধারণ বেসামরিক মানুষ, যারা বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখেন। তাদের এমন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়া উচিত নয়।
আরবিএন