পেশায় গাড়িচালক ফোরকান মিয়া। পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি খুন করেন স্ত্রী, দুই সন্তান ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে। অন্যদিকে মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া জীবনযাপনের জন্য স্ত্রীর সঙ্গে সৃষ্ট পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে নওগাঁর আত্রাইয়ে নিজ বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যা করেন স্বামী জয় সরকার।
এগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায়ই ঘটছে পারিবারিক এমন নৃশংস খুনের ঘটনা। আর যারা এসব ঘটনা ঘটান তারাও কোনো পেশাদার অপরাধী নন। অথচ পারিবারিক এসব ঘটনার নৃশংসতা একটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে আরেকটিকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির দৃষ্টান্ত নয়, দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি ও সামাজি অসুস্থতারও লক্ষণ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ৬ বছর ৩ মাসে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৩১৭ জন নারী। সেই হিসেবে প্রতি বছর স্বামীর হাতে খুন হচ্ছে ২০৮ জন নারী, প্রতি মাসে ১৭ জনেরও বেশি এবং প্রতি দুই দিনে একজন করে নারী স্বামীর হাতে খুন হন।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের ৪০ শতাংশ হয় পারিবারিক কলহের কারণে। নিরপরাধ শিশুরাও স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের কারণে হত্যার শিকার হয়।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১০ থেকে ১২ জন। এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক কারণে। আর এর প্রধান শিকার নারী ও শিশু।
বাবা-মায়ের হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে বাবা-মা, পরকীয়ার কারণে স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এক ভাই আরেক ভাইকে হত্যা করছে। সামাজিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহের কারণে অবলীলায় এভাবে খুন হচ্ছে মানুষ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, সহনশীলতার অভাব, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, আত্মকেন্দ্রিকতা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব ও অস্বচ্ছলতা ইত্যাদি কারণে ঘটছে এসব ঘটনা।
আসকের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন (জানুয়ারী-মার্চ) মাসে স্বামীর হাতে খুন হন ৪১ জন নারী, ২০২৫ সালে ২১৭ জন, ২০২৪ সালে ১৮০ জন, ২০২৩ সালে ২০৭ জন, ২০২২ সালে ২০৬ জন, ২০২১ সালে স্বামীর হাতে খুন হন ২২৪ জন এবং ২০২০ সালে ২৪০ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন।
এ ছাড়া স্বামীর ও নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারাও নারীদের খুনের ঘটনা আছে। শ্বশুরবাড়ি ও নিজ পরিবারের এবং সমাজের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রতি বছর নারীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আত্মহত্যা করছেন।
আসক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা ৫৩ জন এবং নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা ৩২ জন নারী খুন হয়েছেন। ওই বছর আত্মহত্যা করেন ১৪২ জন নারী। ২০২৫ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৬৩ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৫১ জন এবং আত্মহত্যা করেন ১৬৮ জন নারী। ২০২৪ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৪০ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন ৫৮ জন এবং আত্মহত্যা করেন ১৭৪ জন নারী।
২০২৪ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৫৩ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন ৩২ জন এবং আত্মহত্যা করেন ১৪২ জন নারী। ২০২২ স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন ৪৪ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন ৪২ জন এবং আত্মহত্যা করেন ৯৭ জন নারী। ২০২১ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৭৩ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৭৫ জন এবং আত্মহত্যা করেন ১৪২ জন নারী। ২০২০ সালে স্বামীর পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৭১ জন, নিজের পরিবারের সদস্য দ্বারা খুন হন ৫৬ জন এবং আত্মহত্যা করেন ৯০ জন নারী।
পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, লিঙ্গ সংবেদনশীলতার অভাব, সেই সঙ্গে যথাযথ আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধ করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরাধ বিশ্লেষক মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্মত হলেও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ এর কোনো প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আইনটির বিষয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরাও যথাযথভাবে জানেন না। এ বিষয়ে তাদের কোনো প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না।
আইনটি প্রয়োগ না হওয়াকে ‘বড় ট্র্যাপ’ হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় আইনটির এক শতাংশও প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করেই নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। লিঙ্গ সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও ঠিক করতে হবে। সমাজে যে অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে তাও মেরামত করতে হবে। সর্বোপরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সে সঙ্গে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। তা হলেও অনেকাংশে নারীর প্রতি সহিংসতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরিবারের ভেতর থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের জায়গাটা দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর বেশ কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট, সুস্থ পারিবারিক বিনোদনের অভাব, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার। মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধনের জায়গাতেও ঘাটতি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’কে ভিত্তি ধরেই নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই আইনের ধর্ষণ, যৌতুক ও মানব পাচারসহ বেশ কিছু ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সেই সংশোধিত ধারার আলোকেই এ সংক্রান্ত মামলাগুলো করা হয়।
উল্লেখ্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ হলো বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে নারী ও শিশুদের ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক নির্যাতন রোধে প্রণীত একটি বিশেষ আইন। ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর আইনটি কার্যকর হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভুক্তভোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে সুরক্ষা প্রদান, আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নির্যাতনকারীকে আইনের আওতায় আনা।
ঢাকা আহছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী বলেন, সামাজিক, পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে আমরা আমাদের সমস্যা ও মানসিক চাপের সহ্যসীমা নির্ধারণ করতে পারি না। সেটাই একসময় সীমা অতিক্রম করে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখাটা খুব জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মনোবিজ্ঞানী ড. নূর মোহাম্মদ সময়ের আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতার পেছনে মাদকাসক্তি, সামাজিক নিপীড়ন, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সে সঙ্গে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ব্যর্থতা অনেকাংশে দায়ী।
এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, শিশুকাল থেকেই এ জন্য শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব শিশুর বেশি জেদি তাদের রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা দিতে হবে। আর বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরকে ছাড় দেওয়ার মনোভাব থাকা খুবই জরুরি। এজন্য প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। কাউন্সিলিং করলেও মানুষের মনোজগতের অনেক নেতিবাচকতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
পারিবারিক সহিংসতার পেছনে মাদকের একটি বড় প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাও সহিংসতার ঘটনা ঘটায়। না জেনে, না বুঝে এমন কিছু আচরণ তারা করে যা সমাজসিদ্ধ নয়। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবার বাড়ছে। যখনই একক পরিবার আবির্ভূত হলো তখনই সন্তানকে স্বার্থপর হতে শেখাচ্ছি আমরা। আমরা ভাগ করে খাবার খাচ্ছি না। কষ্টগুলো ভাগ করছি না। একাকিত্বকে অনুভব করছি আমরা।
তিনি আরও বলেন, পারিবারিক সহিংসতা রোধে সরকারেরও বড় পর্যায়ে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মাদক পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতায় একটি বড় ভূমিকা রাখে। এই মাদক নির্মূলে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বৃদ্ধি করা সরকারের দায়িত্ব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও কাউন্সিলর রাখার পরমর্শ দেন তিনি।
নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের একটি থানার ওসি বলেন, মানুষের ভেতর ভয়-ভীতি কমে গেছে। কারণ একজন ধর্ষককে গ্রেফতারের ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে সে জামিন পেয়ে যায়। আবার আইনের দীর্ঘসূত্রতার কারণেও অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যায়। ফলে সমাজে একটি মেসেজ যাচ্ছে যে- ‘অপরাধ করলে কিছু হয় না।’ এই মেসেজটা ভয়হীনতার সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তাদের যদি জেলে রেখেই দ্রত বিচার করা যেত তা হলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যেত।
সময়ের আলো/আআ