কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড শনিবার কেবল একটি রাজনৈতিক মঞ্চই হয়ে থাকেনি, পরিণত হয়েছিল ইতিহাসের সাক্ষীতে। কীর্তনের সুর আর ধামসা-মাদলের তালে ছৌ নাচ ও বাউল গানের আবহে গোটা ব্রিগেড সেজে উঠেছিল বাংলার সংস্কৃতির রঙে। সেই মঞ্চেই নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বাংলা ভাষায় শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্যপাল আর এন রবির উপস্থিতিতে গেরুয়া পোশাকে শপথ নেওয়ার মুহূর্তে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে উপস্থিত জনতা। মঞ্চে শোভা পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও দেবি দুর্গার কোলাজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঙালিয়ানার আবহেই পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপির সরকার আত্মপ্রকাশ করল। আর ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে মুখরিত ব্রিগেড যেন রাজনৈতিক পালাবদলের নতুন বার্তা দিল।
এদিন শুভেন্দুর সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনীয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম টুডু। শপথের পরপরই মুখ্যসচিব ও ডিজির সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে বসেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নেই হবে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ উপস্থিত ছিলেন একাধিক ভিভিআইপি। বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শেষযাত্রার সঙ্গী প্রবীণ মাখনলাল সরকার। প্রধানমন্ত্রী তাকে মঞ্চে সংবর্ধনা জানিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। সেই দৃশ্য ঘিরে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে সভামঞ্চে।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থান বরাবর আন্দোলনের পথ ধরে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে তিনি রাজ্য রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। বাম সরকারের পতনে নন্দীগ্রামের ভূমিকা আজও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। পরে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বড় চমক দেন শুভেন্দু।
গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে ভবানীপুরেও তাকে হারানোর দাবিতে সরব হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০৭টি আসন জিতে বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এই ঐতিহাসিক জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
রাজনৈতিক মহল বলছে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের বাংলায় বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম মুখ এখন তিনিই। পূর্ব মেদিনীপুর থেকে উঠে আসা এক জেলা পর্যায়ের নেতার হাতেই এবার বাংলার শাসনভার এলো। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব শুভেন্দুর দাবি ছিল, জেলা থেকেও রাজ্য পরিচালনা সম্ভব।
ব্রিগেডের মঞ্চে শপথ নিয়ে সেই দাবিকেই বাস্তবে রূপ দিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান রাজ্যপাল। বাকি মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ আগামী সোমবার লোকভবনে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা। বুধবার নবনির্বাচিত বিধায়কদের শপথগ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হবে।
শনিবারের শপথগ্রহণ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য দেখা যাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রথম দফার মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন অঞ্চল ও সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বিজেপি। দলটির সংগঠন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া দিলীপ ঘোষের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্য সভাপতি হিসেবে তার নেতৃত্বে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপই দিলীপকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে মন্ত্রী করায় ‘শিল্পাঞ্চল ও নারী নেতৃত্ব’ দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
অগ্নিমিত্রা রাজ্য রাজনীতিতে আন্দোলনমুখী নেত্রী হিসেবেও পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় এসেছেন নিশীথ প্রামাণিক। বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রের বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়াকে মন্ত্রী করায় মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্বের ইঙ্গিত দেখছে রাজনৈতিক মহল।
জঙ্গলমহল ও কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরতে ক্ষুদিরাম টুডুকে মন্ত্রী করা হয়েছে। তিনি সাঁওতালি ভাষায় শপথ নেন। তবে কে কোন দপ্তরের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
সময়ের আলো/আআ