হামের টিকার কোনো সংকট ছিল না অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রাদুর্ভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিবিধ

দেশে হামের টিকার কোনো সংকট ছিল না। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দেশে হামের ২২ লাখ টিকা আসে। আর এই টিকা

2026-05-10T05:19:42+00:00
2026-05-10T05:19:42+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বিবিধ
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা
হামের টিকার কোনো সংকট ছিল না অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রাদুর্ভাব
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৫:১৯ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দেশে হামের টিকার কোনো সংকট ছিল না। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দেশে হামের ২২ লাখ টিকা আসে। আর এই টিকা ইপিআরে মজুদ ছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলো ঢাকার বাইরে বণ্টন করা হয়নি। কাজেই টিকা নয়, বরং অব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। 

শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। একই অনুষ্ঠানে শিশু মৃত্যুর কারণ ও দায়িত্বে কারও গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী।

গোলটেবিলে টিকা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গবেষক (আইসিডিডিআরবি) ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি বলেন, টিকার ঘাটতির কথা জানানোর পর টিকা ক্রয় করা হয়। আর সেই টিকার প্রথম চালান আসে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ওই সময় ২২ লাখ টিকা আসে। ওই টিকার দ্বিতীয় চালান আসে গত ৫ মে। আর ওই টিকা ঢাকার বাইরে না পাঠিয়ে ইপিআরে মজুদ করে রাখা হয়।

টিকার অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, মাঠে টিকা নেই সেটা সত্যি। কিন্তু ইপিআরে টিকা মজুদ ছিল। মহাখালী থেকে টিকা নিয়ে গাড়ি নড়ে না, কারণ তেল নেই। তেলের পয়সা নেই দেখে টিকা জেলাগুলোতে গেল না। কথা হচ্ছে টিকা ছিল নাকি ছিল না, টিকা অবশ্যই ছিল কিন্তু গাড়ির তেলের পয়সা নেই সেই কারণে এই টিকা পৌঁছানো হয়নি। আবার জেলাগুলো ও উপজেলা থেকে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা নিয়ে যায় তাদের টাকা দেওয়া হচ্ছে না, না খেয়ে তারা কয়দিন কাজ করবে। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে টিকা না পৌঁছানোয় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকার যে চেষ্টা করছে সেটা জোড়াতালি। করোনার সময়েও এমনটা দেখেছি। সাপ্লাই চেইনে যে কর্মীরা আছে তাদের স্থায়ী না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনবার আন্দোলন করতে দেখেছি তাদের। সিস্টেমে যেখানে গ্যাপ আছে সেটা দূর করতে হবে। সবার কেন ঢাকায় আসতে হবে। কারণ ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বলা হয় সব চিকিৎসা ফ্রি। এখানে তো সব চিকিৎসা নেই, ওষুধ নেই, এটা নেই-ওটা নেই। এই দায়ভার শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। যতগুলো সরকার ছিল সবাই দায়ী।

বিএমইউর শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, ৯ মাসের নিচে এমন ৩৩ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর রেশিও ৪৫ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ৬ মাস পর ৫৬ শতাংশ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। তবে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কোনো মা আক্রান্ত হলে নবজাতকের অবস্থা অনেক খারাপ হতে পারে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম হতে পারে।

ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ড. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, রুটিন ইপিআই কার্যক্রমে অন্তত ১৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যাচ্ছে না। সময়মতো রুটিন টিকা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে হামের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব নয়।

মায়ের বুকের দুধ পানের গুরুত্ব তুলে ধরে ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সচেতনতা, বুকের দুধ পান ও পুষ্টি বাড়ানো গেলে হামের প্রাদুর্ভাব কমে যেত। ব্রেস্ট ফিডিং কমে যাওয়ার প্রাদুর্ভাব হলো হাম। ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খেলে ওই বাচ্চার কোনো রোগ হয় না। এদিকে ডিজি অফিস থেকে এখনও অনেক তথ্য পাওয়া যায় না।

কারণ সেখানে দোসররা বসে আছে। শতকোটি টাকার আইসিইউ যন্ত্রপাতি সেগুলো ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে। কারণ আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। বর্তমান সরকার দেশে হামের টিকা দিয়ে ৯৫ ভাগ কাভার করেছে। সরকার স্বাস্থ্য সেবায় অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে অনেক রোগবালাই কমে আসবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের ক্যাম্পেইনে অনেক শিশু কভারেজের বাইরে ছিল। সেই কারণেই আজকের এই প্রাদুর্ভাবের চিত্র। আমরা আশা করছি যথাযথভাবে হাম মোকাবিলা করব।

বৈঠকে অভিযোগ করে বক্তারা আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ বলছে ২০২১ সাল থেকে ডিজিস বাড়ছে, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও ডিজিস বাড়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকা নিতে দেয়নি।


বৈঠকে দেশে হামের টিকার সংকট এবং এ রোগের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশু মৃত্যুর কারণ ও দায়িত্বে কারও গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে এক সাংবাদিক জানতে চান, টিকার সংকট ও হামের ঘটনায় কোনো তদন্ত হবে কি না? জবাবে কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমি এখন একটু বিস্তারিতটা না বলি, তদন্ত হবে। এটা আমাদের ওপরে আস্থা রাখেন। কাজ করছি। 

সর্বোচ্চ লেভেল থেকেও বলছি, তদন্ত করছি। ইনশাআল্লাহ তদন্ত রিপোর্ট আপনারা জানতে পারবেন।
তিনি বলেন, কেন আমাদের এই বাচ্চাগুলো হারালাম, কী কারণে, কোথায় সমস্যা ছিল, আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না বা আমাদের কর্মকর্তাদের কী দায়দায়িত্ব নির্ধারণ হবে- সবই একটা তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। এটা আপনারা দেখবেন।

পরে সাংবাদিকরা জানতে চান, তদন্ত শুরু হবে নাকি তদন্ত হচ্ছে। জবাবে সচিব বলেন, বলেছি একটা তদন্ত হচ্ছে। এটা নিয়ে মনে হয় বেশি কথা না বলি। আমরা এটা প্রকাশ করব ইনশাআল্লাহ।

আলোচনা সভায় স্বাস্থ্য সচিব তদন্ত শুরু হওয়ার কথা জানালে তাকে প্রশ্ন করা হয় তদন্তে দোষী পাওয়া গেলে কী হবে? তখন তিনি বলেন, আমি জানি যে তদন্ত হচ্ছে। দোষী কে হবে সেটা তদন্ত হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য সচিব বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনায় তদন্ত হওয়া দরকার, জনগণের জানা দরকার এবং আমাদের সরকার আমি মনে করি যে একটা গণতান্ত্রিক সরকার, জবাবদিহিমূলক সরকার। আমরা বিশ্বাস করি সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার জন্য প্রস্তুত। যখনই তদন্ত হবে প্রতিবেদন আপনারা জানবেন। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে আপনারা সবকিছুই জানবেন ইনশাআল্লাহ।

তদন্ত কমিটি হয়েছে কি না প্রশ্নে সচিব বলেন, তদন্ত হচ্ছে। আমি এইটুকুই বলতে পারি যে তদন্ত হচ্ছে। তবে তদন্ত কমিটিতে কারা আছেন, কবে তদন্ত শুরু হয়েছে, কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

স্বাস্থ্য সচিব বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়ার পর টিকা কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকার টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কোভিড পরবর্তী অব্যবহৃত অর্থ থেকে এই টাকা ব্যবহারের কথা বলেন তিনি।

গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি প্রতীত ইজাজ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএইচআরএফের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। এ সময় হাম পরিস্থিতি নিয়ে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরেন বিএইচআরএফের সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান।

বৈঠকে হামের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় শীর্ষক কি-নোট উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পিডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম।

সময়ের আলো/আআ



Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: