৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগে আজীবন ভিসা সুবিধা

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন খাতের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক পর বিদ্যমান নীতিমালা সংস্কার

2026-05-11T01:42:19+00:00
2026-05-11T15:13:16+00:00
 
  বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬,
২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগে আজীবন ভিসা সুবিধা
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ১:৪২ এএম  আপডেট: ১১.০৫.২০২৬ ৩:১৩ পিএম
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন খাতের আমূল পরিবর্তনে নীতিমালা সংস্কার। ছবি : সময়ের আলো
দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটন খাতের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক পর বিদ্যমান নীতিমালা সংস্কার করে ‘ভিসা নীতিমালা-২০২৬’ এর খসড়া প্রণয়ন করেছে সরকার। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রণীত এই নতুন ভিসা নীতিমালায় আধুনিক ও সেবামুখী অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। 

প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের ভারী শিল্প বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় অন্তত ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে তিনি এবং তার পরিবার (স্ত্রী ও সন্তান) বাংলাদেশে আজীবনের জন্য ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (এনভিআর) সুবিধা পাবেন। 

ইতিপূর্বে এই ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এনভিআর সুবিধার এমন সুনির্দিষ্ট ও সহজলভ্য বিধান ছিল না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য এক বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা সাপেক্ষে পাঁচ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যাবে। 

গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বহিরাগমন শাখা-২-এর উপসচিব আরিফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে খসড়া নীতিমালা সম্পর্কে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, পররাষ্ট্র সচিব, এনএসআইয়ের মহাপরিচালকসহ সরকারের ২১টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা প্রধানের কাছে আগামী ১৪ মে’র মধ্যে লিখিত মতামত চাওয়া হয়েছে।

সরকারি সংস্থাগুলোর মতামত পাওয়ার পর এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, দক্ষ জনবল এবং পর্যটকদের বাংলাদেশে আসা আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে বলে মনে করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। 

নতুন ভিসা নীতিমালায় সরকার অবৈধ অভিবাসন রোধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিদেশি কোনো নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম ১৫ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ১ হাজার টাকা, পরবর্তী ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ২ হাজার টাকা এবং এরপর থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা হারে জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

নীতিমালায় শুধু বিদেশি নাগরিক নয়, তাদের স্পন্সর বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকেও সমানভাবে দায়বদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোনো বিদেশি নাগরিক তথ্য গোপন করে বা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত হন তা হলে ওই নিয়োগকারী বা স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রথমবার লঙ্ঘনের জন্য ১ লাখ টাকা এবং পরবর্তী প্রতিবারের জন্য ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।

এ ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিবেচনায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা নাগরিকদের জন্য কিছু বিশেষ নিয়ম রাখা হয়েছে নতুন নীতিমালায়। এই দুই দেশের কোনো নাগরিক যদি ৯০ দিন বা তার বেশি মেয়াদের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন, তা হলে তাকে বাংলাদেশে পৌঁছানোর ১৪ দিনের মধ্যে স্থানীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক এবং তাদের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত বংশধরদের জন্য এনভিআর সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে নীতিমালায়। 

এই সুবিধার আওতায় তারা আজীবন বাংলাদেশে ভিসা ছাড়াই আসা-যাওয়ার সুযোগ পাবেন এ জন্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ মার্কিন ডলার।

পারিবারিক বন্ধন ও জাতীয় আবেগ বিবেচনা করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান শিথিল রাখার ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে জরিমানার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন নীতি অনুযায়ী কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম ৯০ দিন পর্যন্ত কোনো জরিমানা ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানের সুযোগ পাবেন।

তবে মেয়াদ তিন মাস অতিক্রম করলে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা এককালীন জরিমানা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এই অবৈধ অবস্থানের মেয়াদ ছয় মাস পার হয়ে গেলে সাধারণ বিদেশিদের মতো প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা হারে জরিমানা এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুন নীতিমালায় ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রুত সময়ের মধ্যে ই-ভিসা ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সব ক্ষেত্রেই মেশিন রিডেবল ভিসা বাধ্যতামূলক রয়েছে। 

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ৩০ দিনের অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। 

এই অন অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর বিশেষ ক্ষেত্রে (যেমন সরকারি কাজ, বিনিয়োগ বা পারিবারিক কারণ) ২০০ ডলার ফি প্রদান সাপেক্ষে ভিসা ক্যাটাগরি পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা ছাড়পত্রের প্রতিবেদন অনুরোধ করার ২১ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে। যদি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদন না পাওয়া যায়, তবে ভিসা ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্র তৈরি হওয়া এবং বিদেশি রোগীদের আগমন সহজ করতে সরকার প্রথমবারের মতো ‘মেডিকেল ট্যুরিজম’ নামে একটি স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি চালু করেছে। এর অধীনে রোগীরা তিন মাসের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা পাবেন, যা প্রয়োজনে এক বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। 

চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ‘মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট’ ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়েছে নতুন এই নীতিমালায়। একজন রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন সহযোগী এই ভিসার আওতায় আসতে পারবেন যাদের ভিসার মেয়াদ মূল রোগীর ভিসার মেয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদেশি আয়ের একটি নতুন উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিদ্যমান ভিসা কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নতুন এ নীতিমালা কার্যকর হলে এর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান ও ভিসা নবায়ন প্রক্রিয়া আরও আধুনিক, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশ নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে আধুনিক ভিসা কাঠামো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বৈধ যাতায়াত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার নীতিগত সংস্কার নিয়ে কাজ করছে।

/এসএকে


  বিষয়:   লাখ  ডলার  বিনিয়োগ  ভিসা  বাংলাদেশ  বিদেশি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: