মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং শুধু প্রকৃত অপরাধীরাই বিচারের আওতায় আসে- সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এমন তথ্য জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
একই সঙ্গে দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে মামলাজট কমাতে নতুন বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে দুটি পৃথক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ পুনর্গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালেই বিচার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে।
তিনি বলেন, বিচার যেন ন্যায়সংগত হয়, সে জন্য পলাতক আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও নিশ্চিত করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) রুলস অব প্রসিডিউর, ২০১০-এর বিধি ৪৩ ও ৪৫সি অনুযায়ী ১৭টি মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সরকারি খরচে ৪৪ জন আইনজীবীকে স্টেট ডিফেন্স লইয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, এর মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করছে যে, যারা প্রকৃত অপরাধ করেছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
মন্ত্রী জানান, বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ পাস করা হয়েছে। ফলে জাতিসংঘসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন।
সংশোধিত আইনে ভার্চুয়াল শুনানি, ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সাক্ষী ও নতুন প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিচার যাতে অযথা বিলম্বিত না হয়, সে জন্য অন্তর্বর্তী আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হলেও বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পলাতক আসামিদের বিচার এড়ানোর প্রবণতা রোধে ট্রাইব্যুনালকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আসামির দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার, আইনজীবীর সঙ্গে গোপনে পরামর্শের অধিকার, প্রয়োজন হলে সরকারি খরচে দোভাষী নিয়োগ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীদের বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের নিশ্চয়তাও আইনে যুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতের মামলাজট কমাতে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগ দেবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের আলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
মন্ত্রী আরও জানান, অধস্তন আদালতগুলোতে বর্তমানে ২ হাজার ৬২০টি বিচারকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৯৬৪ জন। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
শূন্যপদ পূরণে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। ইতিমধ্যে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯তম বিজেএসের মাধ্যমে আরও ১৫০ জন এবং ২০তম বিজেএসের মাধ্যমে ২০০ জন সিভিল জজ নিয়োগের জন্য কমিশনের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এসব নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারির প্রস্তুতিও চলছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি