ভয়াবহ হানিট্র্যাপে অনেকের মানকুল সবই যাচ্ছে। অপরাধীরা অস্ত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে ‘হানিট্র্যাপকে’। আর লোকলজ্জায় এসব তথ্য চেপে যায় ভিক্টিমরা। এ সুযোগটিকেই কাজে লাগায় অপরাধীরা। এতে অপরাধ চক্রের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় অস্ত্র হয়ে উঠছে ‘হ্যানিট্র্যাপ’।
গোয়েন্দাদের কার্যক্রম নিয়ে নানা শিহরণজাগানো গল্প-গুজবের একটা বিশ্বজনীন রূপ রয়েছে। আর আন্তর্জাতিক গোয়েন্দাদের যেসব গল্পকাহিনি শোনা যায় সেসব যেন বাস্তব হয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের অপরাধ জগতে। প্রথমে প্রেমে গদগদ হওয়ার ভান।
এরপর পরিকল্পিতভাবে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠা। সেই টোপ গিললেই অজানা ট্র্যাপের শিকার হতে হবে। এরপর জোর করে তৈরি করা হয় নগ্ন ভিডিও। আর নগ্নছবি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস জব্দ করে অর্থের জন্য সেসবকে পুঁজি করে চলে ব্ল্যাকমেইল। কেউ কেউ হন অপহরণের শিকারও। এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটে। এই প্রেমময় ফাঁদ থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে অনেক পুরুষের জন্য। আর বের হলেও অনেক ক্ষেত্রে লজ্জায় সেই ফাঁদের ঘটনার তথ্য জানানো হয় না পরিবার কিংবা প্রশাসনকে। এমন ঘটনায় লজ্জাকেই যেন বানানো হয় অস্ত্র- এক কথায় ‘হানিট্র্যাপ’।
রাজধানীসহ সারা দেশেই এমন হানিট্র্যাপের ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। এ চক্রের সদস্যদের মূল টার্গেটে থাকেন ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী। তবে এখানে রাজনীতিবিদদের টার্গেট করা হয় কম। তবে সেই অঙ্গনেও এই ট্র্যাপ পাতা হয় ব্ল্যাকমেইল কিংবা বিপরীত পক্ষের কাছ থেকে স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে।
অন্যদিকে হানিট্র্যাপের নেটওয়ার্কেও সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করা দুষ্কর। তারা একাধিক সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করে বলে পুলিশের ভাষ্য। এ চক্রের সবাই বেকার নয়। তবে বিভিন্ন পেশার আড়ালে তারাও এই অপরাধ চক্রে জড়িয়ে পড়ে।
সর্বশেষ গত পরশু রাজধানীতে এই হানিট্র্যাপ চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এক বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণকারী কর্মকর্তার সঙ্গে ঋণগ্রহীতার পরিচয়ে যোগাযোগ স্থাপন করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে চক্রের এক নারী। পরে ওই ব্যক্তিকে দেখার করার কথা বলে খিলগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে প্রথমে মারধর ও পরে বিবস্ত্র করে ওই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করানো হয়।
এ সময় ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, নগদ টাকা, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে তার কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। একই সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাব এবং বিকাশ ও উপায় অ্যাপের মাধ্যমে মোট এক লাখেরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। পাশাপাশি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করা হয় ওই ব্যক্তিকে।
ঘটনায় ভুক্তভোগী গত ২২ জুন খিলগাঁও থানায় মামলা করলে অভিযান চালিয়ে চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস পর্যালোচনায় দেখা যায়, একই কৌশলে একাধিক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে নির্যাতন করেছে এবং তাদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছে চক্রটি। অন্যদিকে গ্রেফতার হওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আগে থেকে ডাকাতি ও সম্পদ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক মামলা রয়েছে।
গ্রেফতারদের পেশাগত পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন বলে তদন্তে জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে, আরেকজন একটি বাসার কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করত। বিভিন্ন পেশার আড়ালে তারা এই অপরাধ চক্রে জড়িত ছিল বলে জানায় ডিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, চক্রটি মূলত ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করত। তাদের একটি নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ বা ‘স্টাডি’ থাকত- কোন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা সম্ভব, সেটি আগে যাচাই করেই তারা টার্গেট নির্বাচন করত।
গত ১৬ জুন গাজীপুরের টঙ্গীর মুদাফায় হানিট্র্যাপ চক্রের খপ্পরে পড়েন সালেহিন মিয়া নামে এক ব্যক্তি ও তার বন্ধু। চক্রের নারীরা তাদের বাসায় ডেকে নিয়ে আটকে রাখে এবং রড দিয়ে পিটিয়ে ৭৬ হাজার টাকা ও স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেয়। ওই মাসেই একই ফাঁদে ফেলে ঢাকায় এক উবার চালককে অপহরণ করে হত্যার পর তার গাড়ি ছিনতাই করা হয়। পরে পিবিআই তদন্ত করে ঢাকা, গাজীপুর ও কক্সবাজার থেকে জড়িত চারজনকে (এক নারীসহ) গ্রেফতার করে এবং ছিনতাই হওয়া গাড়িটি উদ্ধার করে।
সম্প্রতি বরিশালে সরকারি কর্মকর্তাকে ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ৫ লাখ টাকা দাবি করে ব্ল্যাকমেইল এবং ফেসবুকে নারীদের ভুয়া প্রোফাইল খুলে তরুণদের টার্গেট করা এক চক্র খিলক্ষেত এলাকায় এক ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে আটকে রেখে সর্বস্ব লুটে নেয়। হ্যানিট্র্যাপের ফাঁদের বিস্তার ঘটছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক মাসে (জুনে) সারা দেশে শুধু অপহরণের মামলা হয়েছে ৯০টি, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। হানিট্র্যাপসহ এসব অপহরণ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও যেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ঘটনাগুলো। এ ছাড়া আইনি কার্যক্রমের ধীরগতি ও সময়মতো যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
তবে অপরিচিত ব্যক্তি বা নারীর সঙ্গে মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে নির্জন ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তরিকুল ইসলাম। সে সঙ্গে কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সামাজিক লজ্জা বা আত্মসম্মানের ভয়ে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক কারণে অভিযোগ করতে চান না। ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়ে একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
এই কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, হানিট্র্যাপের সবগুলো চক্রগুলো একসঙ্গে কাজ করে বলে তথ্য পাইনি। তারা নিজেদের মতো করেই আলাদাভাবে ক্রাইমগুলো করে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি এমন ঘটনা নির্মূলের জন্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি