রাজধানীর জনবহুল নগরীতে মেঘ দেখলেই সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি বাড়ে ওয়াসা, বিটিসিএল, তিতাস গ্যাস, ডিএসসিসি ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর।
রাজধানীতে মূল সড়ক এবং অলিগলিসহ প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এই সড়কে বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে নগরবাসীকে পড়তে হয় নানা ভোগান্তিতে। অথচ শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি থেকে বিরত থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্ষা মৌসুম শুরুর প্রথমভাগেই রাজধানীজুড়ে শুরু হয়েছে খোঁড়াখুঁড়ি।
মূল সড়ক ছাপিয়ে অলিগলিতেও চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ লাইন, কোথাও মাটির নিচে নেওয়া হচ্ছে ঝুলন্ত তার, আবার কোথাও স্যুয়ারেজ লাইন ও ওয়াসার পানির লাইন সংস্কারে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি।
এতে রাজধানীর সড়কগুলোতে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা ও যানজট। কারণ খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে রাস্তার বেশিরভাগ অংশই থাকে বন্ধ। অবশ্য ওয়াসা, বিটিসিএল, বিটিআরসি, তিতাস গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ অন্যান্য সব সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি পাঠানোর কথা বলছে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
এই সংস্থা দুটির দাবি, দুই সিটি করপোরেশনের একটি নীতিমালা রয়েছে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির। অথচ এসব নীতিমালা অনুসরণ না করেই প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে যত্রযত্র খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়।
এতে করে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। এ জন্য সব প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি লাইন যাতে একবারেই স্থাপন করে ফেলা যায়, সে কারণেই চিঠি দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে সড়কে খোঁড়াখুঁড়িতে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই খোঁড়াখুঁড়ি করে। এই সংস্থাগুলো সমন্বয় করে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করলে নগরবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।
সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার বলি হচ্ছে নগরজীবন। সড়কের অধিকাংশ স্থানই আটকে রাখা হয়। পাশাপাশি খোঁড়া সড়কের পাশেই রাখা হয় মাটি, পাইপ ও মাটি খোঁড়ার এক্সকাভেটরসহ ছোট-বড় নির্মাণসামগ্রী। কোনো ধরনের যানবাহন চলার সুযোগ নেই।
এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ হেঁটে তারপর রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠতে হয়। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। একই সঙ্গে দেখা দেয় তীব্র যানজট। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে কখনো কখনো। মনে হয় যেন মেঘ দেখলেই সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, গোটা রাজধানীজুড়েই চলছে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি। বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতায় মূল সড়কসহ অলিগলিতে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ, কোথাও বিদ্যুতের লাইন আবার ওয়াসার পানির লাইন বসানোর জন্য কাটা হয় সড়ক।
উন্নয়নের নামে শীত বা গ্রীষ্ম মৌসুমকে বেছে না নিয়ে বর্ষার পুরো সময় ধরেই চলে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি। মূলত মেঘ দেখলেই সড়কে চলে এই কর্মযজ্ঞ। এতে নগরবাসী পড়ে নানা বিড়ম্বনায়।
রাজধানীর কাকইরাইল, সেগুনবাগিচা, তোপখানা রোড, শান্তিনগর, বাংলামোটরের লিংক রোড, পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার, রায়সাহেব বাজার, তাঁতীবাজার, মুগদা ও লক্ষ্মীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি।
এসব সড়কে একটি সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি শেষে সংস্কার করে সড়কটি সুন্দরভাবে পিচ ঢালাই করা হয়। এর পরক্ষণেই আরেক প্রতিষ্ঠান হাজির হয়ে খোঁড়াখুড়ি শুরু করে দেয়। তারা নতুন করে সংস্কার করা সড়কটি পুনরায় কাটতে শুরু করে। আবার কাজ শুরু করলেও দীর্ঘদিন একইভাবে ফেলে রাখা হয়। সংস্থাগুলো নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করে না।
এমনকি জনসাধারণের নিরাপত্তায় নেওয়া হয় না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কোথাও দেখা গেছে, ড্রেনেজ তৈরির কাজ চলছে। আবার কোথাও বিদ্যুতের লাইনের কাজ চলছে। এভাবে বর্ষা মৌসুমে চলে একের পর এক কাজ। ফলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে লেগেই থাকে যানজট।
এতে জনসাধারণের নষ্ট হয় কর্মঘণ্টা আর বাড়ে দুর্ঘটনা। বাড়ছে বায়ুদুষণও। কিন্তু নগরবসীকে এসব ভোগান্তি মাথায় নিয়েই প্রতিদিন চলতে হয়। বিশেষ করে স্কুলগামী কোমলমতি শিশুদের জন্য এ ভোগান্তি আরও চরম আকারে দেখা দিয়েছে। ফলে অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ। তারা চান এই ভোগান্তির অবসান।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কখনো কখনো বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। এমন চিত্র রাজধানীতে দশকের পর দশক ধরে দেখে আসছি। কখনো ওয়াসা, কখনো সিটি করপোরেশন, কখনো বিদ্যুৎ বিভাগ, কখনো বিটিসিএল সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করে।
এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সব সংস্থা সমন্বয় করে কাজ করলে নগরবাসীকে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। প্রতি বছর একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
রাজধানীর কাকরাইল মোড় থেকে খানিকটা দূরে এগুলেই উইলস লিটল ফ্লাওয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিদিন এসব এলাকা দিয়ে শত শত শিক্ষার্থী আসা-যাওয়া করে। কিন্তু সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এ শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় নানা ধরনের বিড়ম্বনায়। কাকরাইল মোড়ে কথা হয় হান্না চৌধুরীর সঙ্গে।
তিনি জানান, তার মেয়ে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তিনি প্রতিদিন স্কুলে মেয়েকে নিয়ে আসেন। কিন্তু স্কুলের অপজিটে (দক্ষিণ পাশে) সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। এখানে স্যুয়ারেজ লাইনের কাজ চলছে।
এ ছাড়া কাকরাইল মোড় থেকে রমনা মডেল থানার সামনে দিয়ে সড়কেও খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সেখানে বিদ্যুতের লাইনের কাজ চলছে। এতে সড়কের বড় একটি অংশ আটকা রয়েছে। ফলে মাটি, পাইপ ও মাটি খোঁড়ার এক্সকাভেটরসহ নানা ধরণের কাজের সামগ্রী রাখা হয়েছে। এতে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে আশা যাওয়া কঠিন।
তিনি বলেন, এ ছাড়া বৃষ্টির দিনে তো আরো সমস্যা। মাটি ওপরে থাকায় কাদা জমে গেছে। সড়ক দিয়ে হাঁটার কোনো অবস্থাই নেই। বিশেষ করে সামনে বর্ষা মৌসুম আসছে। এই সময়ে কেন সড়কে উন্নয়নের কাজ করতে হবে। বিগত দিনে শীত গেল গ্রীষ্মকাল গেল, তখন কেন সংস্থাগুলো এই উন্নয়নের কাজ করল না।
এ ছাড়া পথে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অনেকে।
রাজধানীর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের সামনের অংশের সড়কে চলে খোঁড়াখুঁড়ি। গত দুদিনের বৃষ্টিতে সড়কে বেড়েছে কাদা। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি যানজট বেড়েছে। মূল সড়ক দিয়ে ভেতরের গলিতে ঢুকতেই দেখা দেয় যানজট। এই এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক লিয়াকত আলীর সঙ্গে। তার বাড়ি রংপুর। তিনি দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে রাজধানীতে পায়ে চালিত রিকশা চালান।
তিনি বলেন, দেখেন কীভাবে রাস্তা কেটে রেখেছে। রাস্তা কাটার কারণে রিকশা চালাতে কষ্ট হয়। একদিকে জ্যাম, অন্যদিকে রাস্তায় জলাবদ্ধতা। কখন যে দুর্ঘটনায় পড়ব, তা বলতে পারি না। তারা বৃষ্টির দিনে রাস্তা না কেটে শীতের দিনে কাটলে তো আর ভোগান্তিতে পড়তে হয় না।
রাজধানীর বাংলামোটরের মোড় থেকে হাতের বাম পাশ দিয়ে একটু এগুলেই গলি। এই গলিতে রয়েছে অসংখ্য সিরামিকসের দোকান। এই গলির সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। ফলে এখানকার দোকানের মালিকরাও ক্ষুব্ধ। এই গলিতে কথা হয় সালাউদ্দিনের সঙ্গে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সড়কটি কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। এখানে এক্সকাভেটর ও পাইপসহ নানা সরঞ্জাম রাখা হয়েছে। এমনিতেই এই এলাকায় সিরামিকসের ব্যবসার কারণে যানজট লেগেই থাকে। কিন্তু সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এখন আর হাঁটার জায়গাটুকুও নেই।
আমাদের চলাফেরা করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। গত দুই দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ার কারণে এই ভোগান্তি আরও বেড়েছে। কোনো যানবাহনেরই চলাচলের সুযোগ নেই। বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যেতেও ভীষণ কষ্ট হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই বর্ষার মৌসুমে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি না করে শীত মৌসুম- যখন বৃষ্টি থাকে না, তখন করলে ভালো হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্ষা মৌসুমে এই খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সাধারণ মানুষ আরও বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের মতো এত ঘন ঘন সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় না। সেসব দেশে শহরাঞ্চলে মাটির নিচে ইউটিলিটি ডাক্ট রয়েছে। ইউটিলিটি ডাক্ট হলে সড়ক খুঁড়তে হবে না।
এতে বায়ুদূষণও কিছুটা কম হবে। কিন্তু আমাদের এখানে ইউটিলিটি ডাক্ট নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় ইউটিলিটি ডাক্ট করা হচ্ছে না। কেননা উন্নয়নের নামে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কাজগুলো যারা করেন তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এখানে কমিশন বাণিজ্যের একটি ব্যাপারও আছে।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একটি জনবহুল রাজধানী ঢাকা। ঢাকার সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে আন্তঃসংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। যার যখন প্রয়োজন তখন তারা খোঁড়াখুঁড়ি করে। চলে অন্তহীন সড়ক খোঁড়াখঁড়ি।
ফলে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়। ধুলাবালি ঢাকার বাতাসের মান নষ্ট করে। আর বর্ষা মৌসুমে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাড়ে যানজট। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটে। বাড়ে দুর্ঘটনা। তাই সমন্বিতভাবে সড়ক খোঁড়া হলে ব্যয় ও ভোগান্তি উভয়ই কম হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, একই রাস্তা যেন বারবার খোঁড়াখুঁড়ি না করা লাগে এ জন্য এখন থেকে আমরা কোনো রাস্তার কাজ শুরুর আগে ওয়াসা, বিটিসিএল, তিতাস গ্যাসসহ অন্যান্য সব সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি পাঠাব, যেন একবারেই সব প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি লাইন স্থাপন করে ফেলা যায়।
নগরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা যা করি, তার অধিকাংশই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। এ ছাড়া ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা উচিত।
/এসএকে