মালিবাগ থেকে বাংলামোটর— পথটি কত দূর? কেউ বলবেন, স্বাভাবিক সময়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের পথ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই পথ এখন পাড়ি দিতে লাগে অনেক বেশি সময়। অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেট গাড়ি— কোনো যানবাহনেই স্বস্তি নেই।
রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। প্রতিদিনের এই পরিস্থিতিই পরিচিত যানজট হিসেবে। যানজটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যানবাহনের ধীরগতি, দীর্ঘ সারি এবং এর সঙ্গে বাড়তি শব্দদূষণ। তবে সরকার ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
ঢাকা শহরের কোন সড়কে যানজট নেই— এ প্রশ্নেরও সহজ উত্তর পাওয়া কঠিন। কোন রাস্তায় অবলীলায় যানবাহন চলাচল করতে পারে, সেটিও বলা মুশকিল। পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখতে ধানমন্ডি থেকে শুক্রবার বিকালে আসা এক ব্যক্তিকে একটি সবুজ সংকেতের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। আবার বাংলামোটর থেকে মগবাজার কিংবা মালিবাগ অথবা ফকিরাপুল থেকে শাহজাহানপুর যেতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। একটাই কারণ— যানজট।
যানজটের কারণ সম্পর্কে বুয়েটের অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, এর অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সড়কে যানবাহনের সংখ্যা যখন স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন কোনো যানই স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। সড়কের মোড়ে একাধিক সড়ক থেকে অতিরিক্ত যানবাহন প্রবেশ করলে সব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটে। একপর্যায়ে সড়ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের সূচনা হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়কে চিহ্নিত করা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সড়কের নির্দিষ্ট অংশে বা নির্দিষ্ট দূরত্বে যানবাহন ধারণক্ষমতা কমে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে যানবাহনের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যানজটের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত সড়কে উন্নয়নকাজ চলার কারণে সড়কের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, স্কুল ও অফিসে যাওয়া এবং ছুটির সময়ে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া রয়েছে অদূরদর্শী যানচালনা, সড়কে অপরিকল্পিতভাবে মানুষের চলাচল এবং বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরিভাবে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। রাস্তার তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রধান সড়কগুলোর দুই পাশে যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আবার হকারদের ফুটপাথ দখলের কারণে পথচারীরা মূল সড়কে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়হীনভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িও যানজটকে তীব্র করে তোলে।
প্রতিবেদনে যানজটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যানজটের কারণে প্রতিদিন সাড়ে তিন ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অপচয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি। অর্থাৎ যানজটের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে, যার আর্থিক হিসাব বের করা কঠিন।
আশার কথা হলো, সরকার ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফুটপাথ হকারমুক্ত রাখা। এর কিছুটা দৃশ্যমান পরিবর্তনও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে মিরপুরে হকার উচ্ছেদের পর বদলে গেছে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার চিত্র।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, অর্থবছর পরিবর্তনের ফলে আগামী বর্ষায় ঢাকায় আর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হবে না। বঙ্গবাজার থেকে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মিটার সড়কের দুই পাশে বাসের পার্কিং খুব শিগগিরই সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটও সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী গত ৩০ আগস্টের এক বৈঠকে ঢাকার যানজট নিরসনে সাতটি নির্দেশনা দেন। সেসব নির্দেশনার ফলোআপ করতে গতকাল রোববার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আবারও বৈঠক করা হয়েছে।
জানা গেছে, মহাখালী বাস টার্মিনালে অপেক্ষায় থাকা বাস পূর্বাচল ডিপোতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কমাতে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার জন্যও ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ঢাকা শহরের যানজট নিরসন।
এদিকে রাজধানীতে যত্রতত্র অটোরিকশার চলাচল যানজটের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এসব অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ দ্রুত করার জন্য নগরবাসী অপেক্ষা করছে। কারণ এসব অটোরিকশা অনেক সময় সড়কের আইন-কানুন না মেনে দ্রুতগতিতে চলাচল করে। পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার জন্যও বিন্দুমাত্র সময় দেওয়া হয় না। ফলে পথচারীদের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
যানজট নিরসনে একসময় স্কুলে প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল বাস চালুর পরিকল্পনা থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ভেস্তে যায়। একই সঙ্গে প্রাইভেট গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে একদিন জোড় নম্বর এবং অন্যদিন বিজোড় নম্বরের গাড়ি রাস্তায় নামানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে