অবহেলা নয় সচেতনতাই সুরক্ষা

ডা. নুঝাত আনজুম সুচী

ফিচার

আমাদের দেশে এখনও টাইফয়েড একটি পরিচিত এবং উদ্বেগজনক সংক্রামক রোগ। বিশেষ করে গরম ও বর্ষাকালে রোগটির প্রকোপ তুলনামূলক বেড়ে যায়।

2026-05-11T04:16:20+00:00
2026-05-11T08:58:20+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
অবহেলা নয় সচেতনতাই সুরক্ষা
ডা. নুঝাত আনজুম সুচী
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ৪:১৬ এএম  আপডেট: ১১.০৫.২০২৬ ৮:৫৮ এএম
টাইফয়েড একটি পরিচিত এবং উদ্বেগজনক সংক্রামক রোগ।
আমাদের দেশে এখনও টাইফয়েড একটি পরিচিত এবং উদ্বেগজনক সংক্রামক রোগ। বিশেষ করে গরম ও বর্ষাকালে রোগটির প্রকোপ তুলনামূলক বেড়ে যায়। এই সময়ে হঠাৎ জ্বর এলেই অনেকেই সেটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। 

কিন্তু টানা জ্বর, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা কিংবা পেটের সমস্যার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে টাইফয়েড। বিশেষ করে দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সবাই টাইফয়েডে আক্রান্ত হতে পারেন। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে টাইফয়েড জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।

টাইফয়েড কী?

টাইফয়েড হলো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। স্যালমোনেলা টাইফি নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হয়। সাধারণত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অপরিষ্কার পরিবেশ, খোলা খাবার এবং হাত না ধুয়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস রোগ ছড়ানোর অন্যতম কারণ। 

আমাদের দেশের অনেক এলাকায় এখনও বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে রোগটির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। টাইফয়েডকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। টানা জ্বরের সঙ্গে দুর্বলতা ও পেটের উপসর্গ থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

টাইফয়েডের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকা। সাধারণত জ্বর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং অনেক সময় ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। 

এর সঙ্গে শরীর দুর্বল লাগা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, পেটব্যথা কিংবা ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, কিছু ক্ষেত্রে ত্বকে হালকা লালচে দাগ দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি ও খেতে না চাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

কেন বাড়ছে ঝুঁকি?

নিরাপদ পানি ও খাদ্যাভ্যাসের অভাবই টাইফয়েডের মূল কারণ। রাস্তার খোলা শরবত, অপরিষ্কার ফল, বাসি খাবার বা অপরিষ্কার পানিতে তৈরি বরফ থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও পানি দূষণের কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন না যে তিনি জীবাণু বহন করছেন। ফলে তার হাতের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যেও রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

কীভাবে শনাক্ত করা হয়?

টাইফয়েড নির্ণয়ের জন্য রোগীর উপসর্গের পাশাপাশি কিছু ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। অনেক সময় ব্লাড কালচার বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই টানা কয়েক দিন জ্বর থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

অনেক রোগী জ্বর হলেই ফার্মেসি থেকে নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি প্রবণতা। কারণ ভুল ওষুধ বা অসম্পূর্ণ চিকিৎসার কারণে রোগ পুরোপুরি সারে না, বরং জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে টাইফয়েডের চিকিৎসায় এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসায় যা প্রয়োজন

চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়ম মেনে সম্পূর্ণ ওষুধ খাওয়া। টাইফয়েডের চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। তবে কোন ওষুধ কতদিন খেতে হবে, তা নির্ভর করে রোগীর অবস্থা ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।

অনেক রোগী দুই-তিন দিন পর জ্বর কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে সংক্রমণ আবার ফিরে আসতে পারে এবং জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।

কোন খাবার খাবেন?

টাইফয়েডে আক্রান্ত রোগীদের বিশ্রাম খুব প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে, যাতে শরীরে পানিশূন্যতা না হয়। এ সময় হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই ভালো। যেমন খিচুড়ি, নরম ভাত, স্যুপ, সেদ্ধ সবজি বা ডাবের পানি উপকারী হতে পারে। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার ও বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রতিরোধেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব

টাইফয়েড প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার বিকল্প নেই। সবসময় বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে এবং খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। 

রাস্তার খোলা খাবার, অপরিষ্কার শরবত বা দূষিত বরফ থেকে বিরত থাকা জরুরি। বর্তমানে টাইফয়েড প্রতিরোধে টিকাও পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে জানান চিকিৎসকরা।

অবহেলা নয়

অনেকেই মনে করেন টাইফয়েড খুব সাধারণ একটি রোগ। কিন্তু অবহেলা করলে এটি অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, মারাত্মক সংক্রমণ কিংবা অন্যান্য জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই টানা জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। টানা তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি জ্বর থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। 

কারণ সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসাই পারে টাইফয়েডের ঝুঁকি কমাতে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিরাপদ খাবার ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুললেই টাইফয়েডের মতো সংক্রামক রোগ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা সম্ভব।

লেখক : কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল

/এসএকে


  বিষয়:   টাইফয়েড  সংক্রামক  রোগ  জ্বর 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: