বিগত কয়েক বছরের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পর দেশে এখন নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকার। আর এই স্থিতিশীল সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট আসতে যাচ্ছে আগামী মাসে। আগামী ৭ জুন শুরু হবে বাজেট অধিবেশন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ হবে আগামী ১১ জুন। নতুন বাজেট কেমন হওয়া দরকার এবং বাজেটে কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া দরকার সে বিষয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ। তার সাক্ষাৎকারের বিশেষ অংশ তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এসএম আলমগীর।
সময়ের আলো : গত দুই-তিন বছরের পর দেশে এখন নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকার এসেছে। নতুন সরকার আগামী মাসে নতুন বাজেট দিতে যাচ্ছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বিগত কয়েকটি জাতীয় বাজেটের চেয়ে আগামী বাজেট কেমন হওয়া দরকার বলে মনে করেন বা একজন ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে আসন্ন বাজেটে আপনার প্রত্যাশা কি?
তাসকিন আহমেদ : আমাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। আসলে অর্থনীতি তো আর বোঝে না, দেশে স্থিতিশীল সরকার না অস্থিতিশীল সরকার। অর্থনীতি তার গতিতেই চলতে থাকে। বিগত করোনাকাল থেকেই দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা শুরু হয়। কোভিড-১৯ পরবর্তী ২০২২ সালের দিকে যখন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তখনই ধাক্কা লাগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের। সে সময় দেশের মুদ্রাবাজার অস্থির হয় পড়ে, ডলারের দাম বেড়ে যায়- টাকার মান কমে যায় প্রায় ৪০-৪১ শতাংশ। এরপর এলো ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। দেশে এনার্জি ক্রাইসিস কিন্তু আগে সবসময়ই ছিল, অবকাঠামোগত সমস্যাও সবসময়ের। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেখা দিল নতুন সংকট- মব ভায়োলেন্স। এ কারণে সবার মাঝে একরকম ভীতি কাজ করতে শুরু করল। দেশের অন্য সবার মতো ব্যবসায়ীদের মনেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মব ভায়োলেন্সের কারণে এবং এ জন্য উদ্যোক্তাদের মাঝে বিনিয়োগ আগ্রহ একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। অতীতে আমরা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেছি, কিন্তু এ রকম মব সংস্কৃতির মুখোমুখি তো আমরা কখনো হয়নি।
উদ্যোক্তাদের মাঝে এমনও মনোভাব দেখা দিয়েছিল- অনেকে কারখানা বিক্রি করে দিয়ে ব্যাংকের দায়-দেনা মিটিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ারও প্রস্তুতি নেন। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা বিগত দেড়-দুই বছর সময় পার করেছি এবং এই সময়ে দেশে নতুন বিনিয়োগ হয়নি বললেই চলে।
এই পরিস্থিতি পাড়ি দিয়ে দেশে নির্বাচিত সরকার এসেছে। আমরাও চাই দেশে সবসময় নির্বাচিত সরকার থাকুক- কেউ কখনো অনির্বাচিত সরকার চায় না। নতুন সরকারের কাছে আমরা চাচ্ছি না যে রাতারাতি তারা সব সংকটের সমাধান করে দেবে। তবে সংকট সমাধানের ধারাটা শুরু করতে পারলে আগামী দেড়-দুই বছরের মধ্যে আমরা একটা ভালো অবস্থার দিকে যাব, একটা স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যেতে পারব। আমরা এই নতুন সরকারের সঙ্গে একেবারে ডে-ওয়ান থেকে কাজ করা শুরু করেছি, কিন্তু হঠাৎ করেই যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তৈরি হয় তাতে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে আরও সংকটময় করে দিয়েছে। এই যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব কিন্তু দেশের অর্থনীতি ওই অর্থে এখনও পড়েনি, এর মূল প্রভাবটা পড়বে আরও ছয় মাস পর। এ রকম পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেটে আমাদের প্রত্যাশাটা অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় কথা- এবারের বাজেটা যেন উচ্চাভিলাষী না করে বাস্তবমুখী বাজেট দেওয়া হয়।
সময়ের আলো : উচ্চাভিলাষী বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
তাসকিন আহমেদ : উচ্চাভিলাষী বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো যেন অহেতুক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা না হয়। বিগত সরকারের আমলে নেওয়া পদ্মা সেতু অবশ্যই ভালো প্রকল্প ছিল কিন্তু যখন কোনো মেগা প্রকল্প নেওয়া হবে তখন সেটি থেকে অর্থনীতি কতটা লাভবান হবে সে দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এখনও আমদানিনির্ভর দেশ, রফতানি ছাড়াও আমাদের চলবে না। চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের অর্থনীতির লাইফলাইন। পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করা আগে জরুরি ছিল, নাকি ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে করাটা বেশি জরুরি ছিল। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোন প্রকল্প বেশি অবদান রাখবে তার আলোকেই তো প্রকল্প নিতে হবে এবং অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করে যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করা হয়েছে সেটি করা কতটা যৌক্তিক ছিল। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি- আমাদের অবকাঠামোর উন্নয়নের দরকার আছে কিন্তু কোন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা আগে দরকার সেটি তো ঠিকমতো নির্ধারণ করতে হবে। তাই আমি বলব, আগামী বাজেটে অহেতুক মেগা প্রকল্প না নিয়ে যেন অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অধিক কার্যকরি পদক্ষেপ থাকে। এ জন্যই বলছি, আগামী বাজেট যেন উচ্চাভিলাষী না হয়ে বাস্তবমুখী হয়।
সময়ের আলো : নতুন বাজেটে আয়কর ও মূসক নিয়ে কী ধরনের প্রত্যাশা করছেন?
তাসকিন আহমেদ : বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত ছিল মাত্র ৬.৭ শতাংশ। ফলে উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহে সরকারকে ঋণ ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। যারা ট্যাক্স নেটের বাইরে থেকে যাওয়ায় সরকার প্রতি বছর বড় পরিমাণের রাজস্ব হারাচ্ছে। কর পদ্ধতির অটোমেশন ও সহজীকরণের করার মাধ্যমে সম্ভাব্য করদাতাদের শনাক্ত করা ও কর নেট সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
তাই আগামী বাজেটে আমার প্রস্তাব থাকবে- করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা করা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ রাখা। এ ছাড়া নন-লিস্টেড কোম্পানির করহার লিস্টেড কোম্পানির অনুরূপ ২৫ শতাংশ করা এবং পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড করপোরেট কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করা। পিএসআর ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, কার্যকর করা দরকার। আমদানি পর্যায়ে আগাম কর উৎপাদনকারীদের জন্য পর্যায়ক্রমে বিলুপ্তি ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য হ্রাস করা। ভ্যাট সংগ্রহে অনলাইন ম্যানেজমেন্টের (ওয়েবসাইট) পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ চালু করা। অগ্রিম ভ্যাট ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করে পণ্য বা সেবার চূড়ান্ত মূল্যের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ করা। সিঙ্গেল স্টেপ রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করে দ্রুত ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
সময়ের আলো : আর্থিক খাতের জন্য নতুন বাজেটে কী প্রত্যাশা করছেন?
তাসকিন আহমেদ : বর্তমান বৈশ্বিক সংকট এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতের কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। টেকসই ও স্থিতিশীল আর্থিক খাতের জন্য নীতি ও প্রবিধানের আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং ক্রেডিট প্রবৃদ্ধি ও তারল্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হচ্ছে- স্থানীয় বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধির জন্য নীতি সুদহার যৌক্তিকীকরণ করা। সরকারি ঋণ গ্রহণে দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস এবং ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি। উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন চালু করা জরুরি। ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড নন ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে করপোরেট গভর্ন্যান্স, সুপারভিশন এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে নতুন আইপিও বৃদ্ধি এবং বড় প্রতিষ্ঠান ও এসএমইর তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করা ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ড চালু করা।
সময়ের আলো : শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য কী প্রত্যাশা করছেন আগামী বাজেটে?
তাসকিন আহমেদ : দেশের শিল্প ও বাণিজ্যকে শক্তিশালী করতে এবং রফতানি বাড়িয়ে একটি টেকসই অর্থনীতি গড়তে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজার খোঁজা খুব জরুরি। এই লক্ষ্য অর্জনে কৃষি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হাইব্রিড গাড়ি, হালকা প্রকৌশল, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং আইসিটি খাতের মতো সম্ভাবনাময় শিল্পগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হচ্ছে- চামড়া শিল্প উন্নয়নে কার্যকর সিইটিপি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও ব্যক্তি পর্যায়ে ইটিপি স্থাপনের জন্য সহজশর্তে ঋণ নিশ্চিত এবং কৃষিপণ্যের প্রসারে পণ্যভিত্তিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
সময়ের আলো : নতুন বাজেটে অবকাঠামো খাতের জন্য আপনার প্রত্যাশা কী?
তাসকিন আহমেদ : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতি বাড়াতে শক্তিশালী অবকাঠামোর বিকল্প নেই। অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কারণে ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে পরিবহন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক উন্নত করা এবং পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমানো জরুরি, যা শিল্প উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াবে। তাই এ খাতের জন্য আমার চাওয়া- অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে উচ্চমূল্যের নির্মাণ উপকরণ এবং মেশিনারির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় নিশ্চিত করা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড, সুকুক ও অন্যান্য ইনোভেটিভ ফাইন্যান্সিং মডেল চালু করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা।