দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ক্ষুদ্র ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিস্তৃতি কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-ঋণ’ নিতে পারবেন একজন ক্ষুদ্র গ্রাহক। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ১২ মাস মেয়াদে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হবে বাজারভিত্তিক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এলে সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে গ্রাহকরা তুলনামূলক কম খরচে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরাপদ ঋণপ্রদান নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্বল্প আয়ের মানুষ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থপ্রাপ্তি আরও সহজ হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন ব্যবহার গত এক দশকে অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। এর ফলে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় ‘ই-ঋণ’ চালুর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারবে আরও সহজে এবং দ্রুত সময়ে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক আগে ব্যাংকে গিয়ে ঋণ নিতে দ্বিধা করতেন বা সময়ের অভাবে তা করতে পারতেন না, তারা এখন ঘরে বসেই ঋণ আবেদন করতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ই-ঋণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়া। ঋণ আবেদন, যাচাই, অনুমোদন, বিতরণ এবং আদায় সবকিছুই অনলাইন বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এতে সময় ও খরচ উভয়ই কমবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা অনিয়মের সুযোগও কমে আসবে। আর গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক যাচাই, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড এবং টু-ফ্যাক্টর বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে জালিয়াতির ঝুঁকি কমায় লেনদেন আরও নিরাপদ হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে সংরক্ষণ বা শেয়ার করা যাবে না এমন কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হলেও সিস্টেম পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত তাৎক্ষণিক যাচাই বাধ্যতামূলক থাকবে না। তবে ঋণ বিতরণের পর দ্রুত সিআইবি রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে এবং কোনো গ্রাহক তথ্য গোপন করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজিটাল ই-ঋণে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই ডিজিটাল ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকি এই উদ্যোগের সফলতার পথে বাধা হতে পারে। এ জন্য গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে যে, পূর্ণাঙ্গভাবে ই-ঋণ চালুর আগে কমপক্ষে ৬ মাস পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করতে হবে। এতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও কার্যকরভাবে এই সেবা চালু করা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে ৫০ হাজার টাকার ই-ঋণ উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করবে না বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই ক্ষুদ্র ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে নীতিমালা জারি করা হয়েছে। এতে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন, অ্যাপ, ই-ওয়ালেট এবং নানা ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে ঘরে বসেই সেবা মিলবে। মানুষের ভোগান্তি কমে আসবে। ঋণ পেতে কারও কাছে ধরনা দিতে হবে না। প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই ঋণ পাবেন। আর ডিজিটাল সিস্টেমের কারণে কেউ ভুয়া তথ্য দিতে পারবে না।