নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতভিটার এক কোণায় দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন ষাটোর্ধ্ব ফখরি আবু দিয়াব। যেখানে এক সময় পরম মমতায় মায়ের সাথে বসে চা পান করতেন, আজ সেখানে কেবলই ইট-পাথরের স্তূপ। দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-বুস্তান পাড়ায় কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করা এই ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীর বাড়িটি ২০২৪ সালে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বুলডোজার। আবু দিয়াবের কণ্ঠ আজ রুদ্ধ, তারা শুধু আমার ছাদটুকু কেড়ে নেয়নি, তারা আমার শৈশব, আমার পূর্বপুরুষের ঘ্রাণ আর সব স্মৃতি মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।
আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণ সীমানা ঘেরা সিলওয়ান জেলার আল-বুস্তান পাড়াটি এখন ইসরায়েলের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মূল লক্ষ্যবস্তু। ইসরায়েলি পৌর কর্তৃপক্ষ আল-বুস্তানের ১১৫টি বাড়ির মধ্যে ৫৪টিই গত কয়েক মাসে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অথচ ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদের এই হার ছিল বছরে গড়ে মাত্র একটি বা দুটি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিবেকের মনোযোগ যখন যুদ্ধের ময়দানে, তখন জেরুজালেমে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কয়েক গুণ ত্বরান্বিত করেছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলি প্রশাসনের দাবি, এই বাড়িগুলো যথাযথ অনুমতি ছাড়া নির্মিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনিদের জন্য বাড়ি নির্মাণের অনুমতি পাওয়া এখন মরুভূমিতে জলের প্রত্যাশার মতোই অলীক। বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্ছেদের মূল উদ্দেশ্য কোনো ‘নগর পরিকল্পনা’ নয়, বরং সেখানে ‘কিংস গার্ডেন’ নামক একটি ইহুদি ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক থিম পার্ক তৈরি করা। এর মাধ্যমে তারা আল-আকসা মসজিদের চারপাশ থেকে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যা কমিয়ে একটি ‘ইহুদি বলয়’ তৈরি করতে চায়।
এই উচ্ছেদ অভিযানে সরাসরি মদত দিচ্ছে ‘আতেরেত কোহানিম’ ও ‘এলাদ’-এর মতো উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলো। কাগজে-কলমে এগুলো বেসরকারি সংস্থা হলেও এরা মূলত ইসরায়েলি সরকারের একটি অলিখিত হাত হিসেবে কাজ করে। এরা ১৯৪৮ সালের আগের কথিত মালিকানা দাবি করে কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করছে।
গবেষক জিয়াড ইভহাইস বলেন, এটি কোনো সাধারণ উচ্ছেদ নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমূলে উপড়ে ফেলার ষড়যন্ত্র। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের ওপর এক অমানবিক শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে- হয় তারা নিজেদের বাড়ি নিজেরা ভেঙে ফেলবে, নতুবা ইসরায়েলি পুলিশ এসে বাড়ি ভেঙে দিয়ে তার জন্য কয়েক হাজার ডলারের জরিমানা আদায় করবে। এই চরম মানসিক নির্যাতনের মুখে অনেক পরিবার আজ দিশেহারা।
বাড়ি হারানোর পর পরিবারগুলো আজ ছিন্নভিন্ন। পূর্ব জেরুজালেমে বাড়ি ভাড়ার আকাশচুম্বী দামের কারণে অনেক পরিবার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আবু দিয়াবের মতে, এটি এক নতুন ‘নাকবা’ বা বিপর্যয়। তিনি আশঙ্কা করছেন, সিলওয়ান যদি ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে আল-আকসা মসজিদ ফিলিস্তিনি জনপদ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যা ভবিষ্যতে মুসলমানদের এই পবিত্রতম স্থানের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দখলকৃত এলাকায় কোনো ধরনের স্থায়ী পরিবর্তন বা উচ্ছেদ দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু ইসরায়েল দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, বিশ্ব মিডিয়া এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এখন গাজা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় জেরুজালেমের এই ধীর গতির ‘জাতিগত নিধন’ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
/কহু