পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটিয়ে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে এই বিপুল সাফল্যের কারিগর হিসেবে পর্দার আড়ালে থেকে যে সংগঠনটি সবচেয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে, সেটি হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। বিশ্লেষকদের মতে, এবার স্রেফ সুশাসন নয়, বরং ‘হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষা’র ডাক দিয়ে মেরুকরণের রাজনীতিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে সঙ্ঘ পরিবার।
নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই আরএসএস ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো তৃণমূল স্তরে প্রচার চালিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা বর্তমানে ‘অস্তিত্বের সংকটে’ রয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে এক ভয়াবহ ভীতি প্রদর্শনমূলক প্রচার চালায়। সঙ্ঘের প্রচারকদের ভাষায়, বাংলাদেশের হিন্দুদের যে করুণ অবস্থা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে সাধারণ ভোটারদের বোঝানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গই বাঙালি হিন্দুদের ‘একমাত্র মাতৃভূমি’ এবং বিজেপি ছাড়া এই ভূমি রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এক দশক আগে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-এর শাখার সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার, যা বর্তমানে সাড়ে চার হাজারে উন্নীত হয়েছে। সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা সরাসরি কোনো দলের নাম নিয়ে ভোট না চাইলেও, তারা ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’ এবং ‘হিন্দুত্ব’কে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পরোক্ষভাবে বিজেপির পথ প্রশস্ত করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে থাকা জনরোষকে সুকৌশলে হিন্দুত্বের আবহে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে সঙ্ঘের কর্মীরা।
২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ এবং বাঙালিদের সংস্কৃতি-বিচ্ছিন্ন দল হিসেবে তুলে ধরে সফল হয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আরএসএস-এর দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রচার সেই ভাষ্যকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ মনে করেন, আরএসএস অত্যন্ত সুচারুভাবে বাঙালির মনোজগতে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তির বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে সমর্থন করছে, যা সঙ্ঘের আদর্শিক বিজয়েরই প্রতিফলন।
বিশেষ করে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে সঙ্ঘের সহযোগী সংগঠন ‘সীমান্ত চেতনা মঞ্চ’ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। অনুপ্রবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তারা সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাষায়, এই জয় আসলে ‘হিন্দুত্বের জয়’।
বিজেপি সরকার গঠনের পর পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-এর প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সঙ্ঘের কর্মীরা মনে করছেন, এখন ভয়ের পরিবেশ দূর হওয়ায় আরও বেশি মানুষ প্রকাশ্যেই সঙ্ঘের কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন।
সূত্র/বিবিসি বাংলা
/কহু