প্রতি বছর অনেক মানুষ পবিত্র মক্কা নগরীতে হজ পালন করতে যান। হজ পালনের একটি অংশ হলো জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করা। একসময় এই বিধান পালন করতে গিয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হতো। কিন্তু, সেই মৃত্যুর মিছিল থামিয়েছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রকৌশলী।
জামারাতে পাথর নিক্ষেপের ইতিহাস
পবিত্র ইসলাম ধর্মের পঞ্চম স্তম্ভ হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক একটি বিধান হলো জামারাতে পাথর নিক্ষেপ (রামি আল-জামারাত)। মিনায় অবস্থানকালে হাজীরা তিনটি নির্দিষ্ট স্তম্ভে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন, যা ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী শয়তানের বিরুদ্ধে মানুষের ঈমানি প্রতিরোধের প্রতীক।
ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, হজরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে যখন তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে মিনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, পথে জামারায় পৌঁছালে শয়তান বারবার তাঁকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। সেই প্রলোভন প্রতিহত করতেই তিনি প্রতীকীভাবে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই আজও মুসলমানরা এই ইবাদত পালন করে থাকেন।
একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা
একসময় জামারাত এলাকায় পাথর নিক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট প্রবেশপথ বা বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় হাজিরা যেকোনও দিক থেকে প্রবেশ করতেন। একই জায়গায় বিপুল সংখ্যক মানুষের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায়ই সৃষ্টি হতো ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা।
১৯৯৪ সালের একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা পুরো মুসলিম বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করতে গিয়ে সেবারে ২৭০ জন হাজি প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই ঘটনা হজ ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে এবং একটি কার্যকর সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দেয়।
একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলীর মানবিক উদ্যোগ
এই সংকটময় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী মো. ইব্রাহীম। তিনি সেই সময় হজ পালন করতে গিয়ে জামারাত এলাকায় ভিড়জনিত ভয়াবহ অবস্থা স্বচক্ষে দেখেন এবং ভীষণ ব্যথিত হন।
দেশে ফিরে তিনি বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশলভিত্তিক নিরাপদ চলাচল পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল— হাজিদের চলাচলকে নিয়ন্ত্রিত ও একমুখী করা, প্রবেশ ও প্রস্থান পথ আলাদা করা, ভিড়ের চাপ বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে দেওয়া, দুর্ঘটনার ঝুঁকি সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনা এবং পুরো প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল করা।
তিনি প্রকল্পে উল্লেখ করেন- প্রতিটি জামরাকে বেড়া দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত করতে হবে, যাতে উভয়দিকে দু’টি ভিন্ন রাস্তার সৃষ্টি হয়। জামরার দেয়াল ছয় ফুট বাই ছয় ফুট থেকে উভয়দিকে অন্তত ৩০ ফুট করে বাড়িয়ে দিতে হবে। একমুখী ট্রাফিক সিগনালের ব্যবস্থা করতে হবে। মিনার দিকে ‘ইন’ ও অন্য প্রান্তে ‘আউট’লেখা চিহ্নিত করে হাজিদের চলাচল একমুখি করতে হবে। এতে করে হাজিরা একদিক দিয়ে ঢুকে পাথর মেরে, অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবেন, কেউ পেছনে ফিরবেন না।
এই বিস্তারিত প্রকল্পটি তিনি প্রথমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। সেখান থেকে ঢাকার সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি সরকারকে জানানো হয়। পরিকল্পনাটি এত নিখুঁত এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে, সৌদি সরকার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রকল্পটি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেন।
আধুনিক জামারাত কাঠামোর রূপান্তর
পরবর্তীতে সৌদি আরব সরকার হজ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের আধুনিকায়ন আনে এবং জামারাত এলাকাকে সম্পূর্ণ নতুন প্রকৌশল কাঠামোতে পুনর্গঠন করে। আজকের জামারাত এলাকা একটি অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতীক।
হাজিদের চাপ কমাতে আলাদা আলাদা ফ্লোরে পাথর নিক্ষেপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত ভিড় না হয়। যেমন- পূর্ব দিক থেকে আসা হাজিরা নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজিরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজিরা পঞ্চম তলায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করেন।
১২ টি করে গেইট দিয়ে প্রবেশ ও প্রস্থানপথ আলাদা করা হয়েছে, ফলে মানুষের চলাচল অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ হয়েছে। সার্বক্ষণিক সিসিটিভি মনিটরিং, নিরাপত্তা কর্মী এবং কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রিত থাকে। পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান, সেলুন, বিশ্রাম এলাকা, চিকিৎসা সহায়তা এবং জরুরি সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময় ও গ্রুপভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে কমে গেছে।
এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাডও।
কাজের স্বীকৃতি
জামারাত ব্যবস্থার আধুনিক রূপ শুধু একটি স্থাপত্যগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি মানবিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং ধর্মীয় অনুশীলনের একটি অসাধারণ সমন্বয়। হজের মতো বিশাল জনসমাগমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে সুপরিকল্পিত প্রকৌশল প্রয়োজন, তা এই পরিবর্তনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তাঁর এই অনন্য উদ্যেগের জন্য মুসলিম বিশ্বে ‘আর্কিটেক্ট অব মডিফিকেশন প্লান অব জামরা’ নামে খ্যাতি পান। সৌদি বাদশা ফাহাদ এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মুহিব্বুল খায়ের’ বা কল্যাণকামী উপাধিতে তাঁকে ভূষিত করেন। তাঁর জন্য উপহারসামগ্রীও পাঠান। এমনকি পরবর্তীতে তাঁকে পবিত্র মক্কায় প্রকল্প–প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করারও সুযোগ করে দেন।
তৎকালীন কাবা শরিফের প্রধান ঈমাম শায়খ আবদুস সুবাইল তাঁকে পৃথিবীর ১০ জন সেরা প্রকৌশলীর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মিনায় বর্ধিত প্রকল্পের পাশে রাস্তার ধারে সবুজ গালিচায় সাদা অক্ষরে লেখা আছে ’মোহান্দেস ইব্রাহিম মিনাল বাংলাদেশ’। এটা তাঁর জন্য অনন্য এক সম্মান।
প্রকৌশলী মো. ইব্রাহীমের পরিচয়
১৯৪১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাবুপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী। ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু তৃতীয় বর্ষে উঠে সঙ্গত কারণে মাইগ্রেশন নিয়ে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর জাপানে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে শিক্ষা বিভাগ, বিআরটিসি, ওয়াপদা এবং বিসিআইসিতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিসিআইসির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন মো. ইব্রাহীম।
তিনি বই লিখতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই হলো, রাহে মক্কা রাহে, মদিনা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং, হজ পরিক্রমা, আল কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞান ইত্যাদি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাবুপুর গ্রামে ইসলামিয়া ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বিশ্বখ্যাত এই মানবিক প্রকৌশলী ২০১৭ সালের ৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
/মহু