সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন নগর গোছান তারা

সমীরণ রায়

বিবিধ

সকালে ঘুম ভাঙতেই রাজধানীবাসীর চোখে পড়ে ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন ঢাকা শহর। রাস্তা পরিষ্কার, ফুটপাথ ঝকঝকে, ড্রেনমুক্ত নগর- সবকিছুর পেছনে নিরলস পরিশ্রম

2026-05-14T02:10:42+00:00
2026-05-14T03:05:55+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
বিবিধ
সবাই যখন ঘুমিয়ে, তখন নগর গোছান তারা
সমীরণ রায়
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ২:১০ এএম  আপডেট: ১৪.০৫.২০২৬ ৩:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সকালে ঘুম ভাঙতেই রাজধানীবাসীর চোখে পড়ে ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন ঢাকা শহর। রাস্তা পরিষ্কার, ফুটপাথ ঝকঝকে, ড্রেনমুক্ত নগর- সবকিছুর পেছনে নিরলস পরিশ্রম করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। 

মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখনই তারা কাজে নেমে পড়েন। কেউ রাস্তা ঝাড়ু দেন, কেউ ড্রেন পরিষ্কার করেন, কেউ হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ করেন। অথচ রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন কাজ করা এই মানুষগুলোর জীবন এখনো অন্ধকার, সংকীর্ণতা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

২০২৬ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরকে প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন রাখছেন হাজারো পরিচ্ছন্নতাকর্মী। কিন্তু নগরকে পরিষ্কার রাখা মানুষগুলোর নিজেদের জীবনই রয়ে গেছে অস্বাস্থ্যকর আবাসন, অনিরাপদ চাকরি ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে বন্দি।

শত বছর একই পেশায় বাঁধা জীবন 

রাজধানীর দয়াগঞ্জ, ধলপুর, কমলাপুর, সূত্রাপুর ও গাবতলী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এসব এলাকাই পরিচিত ‘সুইপার কলোনি’ নামে। কোথাও ব্রিটিশ আমলের জরাজীর্ণ ব্যারাক, কোথাও টিনের ঝুপড়ি, আবার কোথাও নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে।

এই জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা অঞ্চলে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসকরা পরিচ্ছন্নতা ও শ্রমনির্ভর কাজের জন্য তেলেগুভাষী দলিত জনগোষ্ঠীকে বাংলায় নিয়ে আসে। নগদ অর্থ ও কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের রেললাইন, পৌরসভা ও চা বাগানে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা পরিচ্ছন্নতার কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

আজও এসব কলোনিতে তেলেগু ভাষার চর্চা রয়েছে। ইডলি-দোসা তাদের প্রিয় খাবার। বিকালে কলোনির প্রবেশমুখে বসে ইডলি-দোসার দোকান। তবে সংস্কৃতি টিকে থাকলেও জীবনমানের উন্নয়ন খুব সীমিত বলেই মনে করেন বাসিন্দারা।

ছোট ফ্ল্যাটে বড় পরিবার 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দয়াগঞ্জ কলোনিতে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনটি ১০ তলা ভবনে ৩৪৩টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন মাত্র ৪১২ বর্গফুট। দুটি ছোট ঘর, একটি রান্নাঘর ও একটি বাথরুম নিয়ে গড়া এসব ফ্ল্যাটে কোনো কোনো পরিবারে আট থেকে ১০ জন সদস্য একসঙ্গে বসবাস করছেন।

অন্যদিকে গাবতলীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন চারটি ১৫ তলা ভবনে ৭৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে। প্রায় ৫৬০ বর্গফুট আয়তনের এসব ফ্ল্যাটে স্কুল, মসজিদ ও খেলার মাঠ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

কম বেতন চাকরির অনিরাপদ 

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিয়োগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন। স্থায়ী কর্মীদের মাসিক মূল বেতন সাধারণত ১৬ থেকে ২২ হাজার টাকার মধ্যে। ঝুঁকি ভাতা, ওভারটাইম ও উৎসব ভাতা যোগ হলে আয় কিছুটা বাড়ে।

তবে আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অবস্থা আরও অনিশ্চিত। দয়াগঞ্জ কলোনির বাসিন্দা ভূপতি আপ্পারাওয়ের মতো অনেক কর্মী মাসে প্রায় ১৮ হাজার টাকা পান। কিন্তু এই চাকরিতে নেই পেনশন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। 

মাস্টাররোলভিত্তিক কর্মীদের দৈনিক মজুরি একসময় ছিল ১৯৫-২০০ টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ২৬৫-২৭৫ টাকা করা হয়।
তাদের ভাষায়, ‘কাজ আছে তো টাকা আছে, না হলে কিছুই নেই।’ দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও তারা নামমাত্র বেতন পান। আবার বয়স ৫৯ বছর হলেই কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন উদ্যোগ পুরোনো অনিশ্চয়তা 

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বুধবার দয়াগঞ্জ পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিবাস পরিদর্শনে গিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, দয়াগঞ্জ, ধলপুর, গণকটুলি, ওয়ারী ও পোস্তগোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ১৮টি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন ভেঙে আধুনিক আবাসন গড়ে তোলা হবে। ভবন নির্মাণের সময় বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা, পানি ও গ্যাস সমস্যার সমাধান, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখছেন। তাই তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’

পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবার জীবন

তবে বাস্তবতা এখনও কঠিন। নতুন ভবনে উঠলেও অনেকের অভিযোগ, প্রকৃত বাসিন্দাদের তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা নেই। রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশে অনেক বরাদ্দ হয়েছে। আবার দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের কেউ কেউ স্থায়ী চাকরি না থাকায় ফ্ল্যাট পাননি।

২৫ বছর বয়সি গোবিন্দ দাশ এখন দয়াগঞ্জের নতুন ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। বাবা-মা ও স্ত্রীকে নিয়ে চারজনের সংসার তার।

গোবিন্দ বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবার জীবন! এই জীবনের আড়ালে শুধু অন্ধকার। ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকি। তারপরও মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ পেয়েছি, এটাই বড় কথা। কিন্তু বাইরের মানুষ আমাদের ভালো চোখে দেখে না।’
হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করা গোবিন্দ বলেন, ‘আগে টিনের ঘরে থাকতাম। এখন অন্তত নিরাপদ ছাদ আছে। কিন্তু জায়গা খুবই কম। অনেক পরিবারে দুই ভাইয়ের পরিবার একসঙ্গে থাকে।’

বাইরের জগতে আমাদের অধিকার নেই 

তেলেগু কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক জোসেফ ইউ কে নন্দম (জয়) বলেন, ‘নতুন ভবন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সবাই সেখানে ফিরতে পারেনি। চাকরি না থাকলে বাইরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আমরা বৈষম্যের শিকার। বাইরে অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন ভবনের কারণে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কিছুটা কমেছে। আগের মতো ঝগড়া-হট্টগোলও হয় না। কিন্তু সামাজিক বৈষম্য এখনও একই রয়ে গেছে। পেশাগত ঝুঁকিও কমেনি।’

তার ভাষায়, ‘আমাদের মধ্যে মাস্টার্স পাস ছেলেও আছে। কিন্তু নাম-পরিচয়ের কারণে চাকরি পায় না। অনেকে বাইরে গিয়ে নিজের পরিচয় গোপন রাখে। এই কমিউনিটি এখনও ১০০ বছর পিছিয়ে আছে। বাইরের জগতে আমাদের প্রবেশাধিকার নেই।’

বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ৫ হাজার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করছেন। তাদের বড় অংশ এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করেন। ড্রেন পরিষ্কার, মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ কিংবা ম্যানহোলে নামার সময় অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত গ্লাভস, মাস্ক বা বুট থাকে না। ফলে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।

রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিদিন যে মানুষগুলো নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেন, তাদের জীবন এখনও অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও অস্বীকৃতির ভারে চাপা পড়ে আছে। ঝকঝকে ঢাকার আড়ালে তাই রয়ে গেছে এক অদৃশ্য অন্ধকারের গল্প।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   পরিচ্ছন্নতাকর্মী  ঢাকা শহর  বর্জ্য অপসারণ 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: